প্রকাশ: ২৯সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল আবারও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। সামনে এএফসি এশিয়া কাপ বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ম্যাচ, যেখানে প্রতিপক্ষ হংকং। ম্যাচ দুটিকে সামনে রেখে জাতীয় দলের প্রধান কোচ হাভিয়ের কাবরেরা ইতোমধ্যে ২৮ জন ফুটবলারকে ক্যাম্পে ডেকেছেন। ক্যাম্পের অনুশীলন শুরু হবে সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর। তবে সমর্থকদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—কবে দলে যোগ দেবেন তিন বিদেশপ্রবাসী ফুটবলার, ইংল্যান্ডের হামজা চৌধুরী, ইতালির ফাহামিদুল ইসলাম এবং যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শমিত সোম। এই তিনজনই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
বাংলাদেশের ফুটবল বহুদিন ধরেই বিশ্বমঞ্চে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য পায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ প্রজন্মের উত্থান, বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারেরা দলে সুযোগ পাওয়া এবং কিছুটা উন্নত পরিকল্পনা ফুটবলপ্রেমীদের মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। হামজা চৌধুরী লেস্টার সিটির মতো বড় ক্লাবে খেলে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, শমিত সোম ইউরোপীয় ঘরানার অনুশীলনের স্বাদ পেয়েছেন আর ফাহামিদুল ইসলামও ইতালির ফুটবলে শানিত হয়েছেন। এই তিনজনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে বড় একটি শক্তির যোগান।
কাবরেরার ডাকা ২৮ জন ফুটবলারের তালিকায় স্থানীয় তারকাদের পাশাপাশি এই তিন বিদেশপ্রবাসীর নাম থাকায় সবার মধ্যে নতুন করে উৎসাহ ছড়িয়েছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) জানিয়েছে, হামজা ঢাকায় আসবেন আগামী ৬ অক্টোবর, আর ৭ অক্টোবর যোগ দেবেন শমিত সোম। ফাহামিদুল ইসলামও তখনই যুক্ত হবেন ক্যাম্পে। এর পরপরই ৯ অক্টোবর ঢাকায় বসবে প্রথম ম্যাচের লড়াই, যেখানে প্রতিপক্ষ হংকং। ফিরতি ম্যাচ হবে ১৪ অক্টোবর, হংকংয়ের মাঠে। ফলে হাতে অনুশীলনের সময় খুব বেশি না থাকলেও কোচ আশা করছেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ফুটবলাররা দ্রুত দলে মানিয়ে নিতে পারবেন।
বাংলাদেশ এ পর্যন্ত বাছাইপর্বে দুটি ম্যাচ খেলেছে। শিলংয়ে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করে কিছুটা আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছিল দল। তবে ঢাকায় সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরে সেই গতি কিছুটা থেমে যায়। দুই ম্যাচে মাত্র এক পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক নয়। তাই হংকংয়ের বিপক্ষে এই দুটি ম্যাচে ভালো ফল করা ছাড়া উপায় নেই। বিশেষ করে ঢাকার ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ‘কর বা মর’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
স্থানীয় খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজরে আছেন জামাল ভূঁইয়া, শেখ মোরসালিন ও রাকিব হোসেন। জামাল ভূঁইয়া অনেকদিন ধরেই দলের নেতৃত্বে আছেন এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে বারবার বাংলাদেশকে টেনে তুলেছেন। অন্যদিকে, শেখ মোরসালিন ও রাকিব হোসেন সাম্প্রতিক সময়ে আক্রমণভাগে চমৎকার পারফরম্যান্স করেছেন। তাদের সঙ্গে ফাহামিদুল যুক্ত হলে আক্রমণভাগে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, রক্ষণভাগ নিয়েও ভাবনা কম নেই। তপু বর্মণ, সাদ উদ্দিন, রহমত মিয়া ও তারিক কাজীর মতো খেলোয়াড়রা একসঙ্গে থাকলেও আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাদের দৃঢ়তা পরীক্ষা দিতে হবে। বিশেষ করে হংকংয়ের মতো শারীরিকভাবে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। তবে গোলবারে মিতুল মারমা ও মেহেদী হাসান শ্রাবণের মতো তরুণ ও সম্ভাবনাময় দুই গোলকিপার আছেন, যারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণে মুখিয়ে আছেন।
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে বিদেশপ্রবাসী খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি নতুন কিছু নয়। এর আগে জামাল ভূঁইয়া দলে যোগ দিয়ে বাংলাদেশকে যেমন স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছিলেন, তেমনি এবার হামজা, শমিত ও ফাহামিদুলের উপস্থিতিও নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। ফুটবল বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তিনজনের মাঠে নামা শুধু দলের পারফরম্যান্স উন্নত করবে না, বরং দলের ভেতরে প্রতিযোগিতা বাড়াবে। এতে স্থানীয় খেলোয়াড়দেরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এত অল্প সময়ে এই তিন ফুটবলার দলের সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন। আন্তর্জাতিক ম্যাচে কেবল ব্যক্তিগত দক্ষতাই যথেষ্ট নয়, দরকার দলীয় সমন্বয়, বোঝাপড়া এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। কোচ কাবরেরা যদিও আশাবাদী, তিনি বিশ্বাস করেন, অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা দ্রুতই খেলার ছন্দে ফিরতে পারবেন।
বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকরা সবসময়ই আবেগী। হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের প্রত্যাশার ঝড় বইছে। কেউ লিখছেন, “হামজা এলে মাঝমাঠ আরও শক্ত হবে।” আবার কেউ কেউ মনে করছেন, “শমিতের মতো ফুটবলার দলে এলে আক্রমণে গতি বাড়বে।” তবে সমর্থকদের পাশাপাশি ফুটবল বোদ্ধারাও বাস্তবতা ভুলতে চাইছেন না। তারা বলছেন, “প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হলেও লড়াই করার মানসিকতা দেখাতে হবে বাংলাদেশকে। ফলাফল আসবে ধীরে ধীরে।”
বাংলাদেশ ফুটবলের সামগ্রিক চিত্রে এই বাছাইপর্ব অনেক বড় একটি পরীক্ষার মতো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখার জন্য শুধু হংকংয়ের বিপক্ষে নয়, ভবিষ্যতের প্রতিটি ম্যাচেই দলের উন্নতি প্রয়োজন। হামজা-শমিত-ফাহামিদুলদের অন্তর্ভুক্তি হয়তো এখনই বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। বিশেষ করে তরুণ খেলোয়াড়রা যদি তাদের সঙ্গে খেলে শেখার সুযোগ পান, তবে ভবিষ্যতের জন্য এটি বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়াবে।
আগামী ৯ অক্টোবর ঢাকায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি শুধু একটি খেলা নয়, বরং বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য মর্যাদার লড়াই হয়ে উঠতে চলেছে। সমর্থকরা আশা করছেন, মাঠ ভর্তি দর্শকদের সামনে খেলোয়াড়রা নিজেদের সেরাটা দেবেন এবং দেশের ফুটবলকে আবারও আলোচনায় ফেরাবেন।