প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
খাগড়াছড়িতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তীব্রভাবে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) রোববার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এলাকার নারী এবং স্কুলগামী শিশুদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করছে।
আইএসপিআরের পরিচালক লে. কর্নেল সামি উদ্দৌলা চৌধুরী জানিয়েছেন, ধর্ষণসহ যেকোনো ধরনের অপরাধ আইনের আওতায় বিচার করা হবে। তিনি বলেন, “ঘটনার সত্যতা নিরূপণ না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে হবে। পাহাড় থেকে সেনা হঠানোর স্লোগান তোলা বা আন্দোলন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেলচালক মামুন হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। এরপর ইউপিডিএফ দীঘিনালা ও রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা চালায়। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন এবং বহু মানুষ আহত হয়। চলতি বছর, হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্তিতে, ইউপিডিএফ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল আয়োজন করে এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা চালায়।
২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ইউপিডিএফের দাবিকৃত সন্দেহভাজন ব্যক্তি শয়ন শীলকে পরবর্তীতে সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে এবং পুলিশ রিমান্ডে নেয়। আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ইউপিডিএফের অঙ্গসংগঠন পিসিপি নেতা উখ্যানু মারমা ‘জুম্ম ছাত্র জনতার’ ব্যানারে বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের ডাক দেন।
২৪ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফের আহ্বানে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। একই সময়ে দেশি-বিদেশি কিছু ব্লগার ও পার্বত্য অঞ্চলের কয়েকজন ব্যক্তি অনলাইনে বাঙালিদের উদ্দেশে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ ওঠে। এর পরের দিন, ২৬ সেপ্টেম্বর, উখ্যানু মারমার নেতৃত্বে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উসকানিতে খাগড়াছড়ি জুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইউপিডিএফের প্ররোচনায় টহলরত সেনা সদস্যদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়, যার ফলে তিনজন সেনা সদস্য আহত হন। সেনাবাহিনী সংযম দেখিয়ে বলপ্রয়োগ না করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে।
২৭ সেপ্টেম্বর, ইউপিডিএফ কর্মীরা পুনরায় দাঙ্গা-হাঙ্গামার চেষ্টা চালায়। খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকায় বাঙালি ও সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানো, ভাঙচুর করা এবং অ্যাম্বুলেন্সে হামলা চালানো হয়। এছাড়া রাস্তা অবরোধের ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরমভাবে অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নিলে জেলা প্রশাসন খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত তৎপরতায় রাতেই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আসে।
পরদিন সকাল থেকে ইউপিডিএফ কর্মীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে গুইমারা উপজেলার রামসু বাজারে অবরোধ গড়ে তোলে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইউপিডিএফ কর্মীরা বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় জড়ায়। সেনাবাহিনীর ওপর দেশীয় অস্ত্র, ইট-পাটকেল ও গুলি নিয়ে হামলা চালানো হয়, এতে তিন কর্মকর্তা ও দশ সদস্য আহত হন। একই সময়ে রামগড়ে বিজিবির গাড়ি ভাঙচুর এবং সদস্যদের আহত করার ঘটনা ঘটে।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রামসু বাজারের পাশের পাহাড় থেকে ইউপিডিএফ সশস্ত্র দল প্রায় ১০০–১৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে, এতে সেনাসদস্যসহ পাহাড়ি–বাঙালি এলাকাবাসীও আহত হন। সেনা টহল দল দ্রুত অভিযান চালালে সশস্ত্র দল পালিয়ে যায়। ইউপিডিএফের বহিরাগত দুষ্কৃতকারীরা রামসু বাজারের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। অতিরিক্ত সেনাদল মোতায়েনের পর বিকেল সাড়ে ৪টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
আইএসপিআর জানিয়েছে, ইউপিডিএফ নারী ও স্কুলগামী শিশুদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করছে এবং বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দেশীয় অস্ত্রসহ পার্বত্য অঞ্চলে নিয়ে আসছে। ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে বিজিবির কাপ্তাই ব্যাটালিয়নের একটি চেকপোস্টে ইউপিডিএফের পরিবহনকৃত বিপুল দেশীয় অস্ত্র জব্দ করা হয়।
আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৯ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাগড়াছড়ি ও গুইমারা এলাকায় ঘটে যাওয়া সব ঘটনা একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সেনাবাহিনীসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে।
সেনাবাহিনী পার্বত্য অঞ্চলের সব জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও জনসাধারণকে সংযত আচরণ করার জন্যও আহ্বান জানিয়েছে। আইএসপিআর বলেছে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ইউপিডিএফ এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে সুপরিকল্পিতভাবে নারী এবং স্কুলগামী শিশুদের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করছে। এই কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র স্থানীয় জনগোষ্ঠী নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও দেশের সার্বভৌমত্বের জন্যও মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেনাবাহিনী সব ধরনের অপপ্রচার, মিথ্যা প্রচারণা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।










