প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় সৃষ্ট বিক্ষোভ ও সহিংসতার একরাতের পর বুধবার গুলিতে নিহত তিনজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। নিহতরা সবাই খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের মধ্যে আথুই মারমা, আথ্রাউ মারমা এবং তৈইচিং মারমা অন্তর্ভুক্ত। নিহতদের বয়স যথাক্রমে ২১, ২২ ও ২০ বছর।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে রোববার, যখন গুইমারার রামসু বাজারে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ ব্যানারের অধীনে একটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগের জের ধরে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভের সময় সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয় ও বাহ্যিক কিছু পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দেয়। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং বিজিবি মোতায়েন করা হলেও সংঘর্ষ থামানো সম্ভব হয় না। সংঘর্ষ চলাকালীন তিনজন নিহত হন।
নিহত আথুই মারমা দেবলছড়ি ইউনিয়নের সিন্দুকছড়ি চেয়ারম্যান পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। আথ্রাউ মারমা হাফছড়ি ইউনিয়নের সাং চেং গুলিপাড়ার এবং তৈইচিং মারমা রামসু বাজার বটতলার। তিনজনের মৃত্যুর ঘটনাটি খাগড়াছড়ি অঞ্চলে এক গভীর শোকের ছায়া ফেলে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা এই ঘটনায় গভীর হতাশা ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
খাগড়াছড়ি সিভিল সার্জন ছাবের আহম্মেদ জানান, রোববার থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত আহত অন্তত ১৪ জনকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, আর একজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। নিহত তিনজনের লাশও হাসপাতালের মরদেহাগারে রাখা আছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, রামসু বাজারে সংঘটিত সহিংসতায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে সেনাবাহিনীর একজন মেজরও আছেন। আহতদের মধ্যে স্থানীয় বাহিনী, গ্রামবাসী এবং কিছু বহিরাগতও রয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে অবরোধকারীরা রাস্তা ও বাণিজ্যিক স্থানে নানা ধরনের ক্ষতি করেছে।
আইএসপিআর ও স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষের সময় অবরোধকারীরা ইট-পাটকেল, দেশীয় অস্ত্র এবং লাঠিসোটা ব্যবহার করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তৎপর থাকলেও পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের সময় তিনজন নিহত হন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রামসু বাজারের অবরোধ ও সহিংসতার কারণে স্থানীয় ব্যবসা, স্কুল-কলেজ এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বাজারের অনেক দোকান ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, ওই এলাকার শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া-আসা বিপর্যস্ত হয়েছে।
পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসময় উল্লেখ করেছেন, পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। তবে স্থানীয় এবং বহিরাগত কিছু ব্যক্তি সংঘর্ষে অংশগ্রহণের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, বিক্ষোভ ও সহিংসতার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে অবিশ্বাস এবং দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। এই ঘটনার মাধ্যমে সামাজিক শান্তি এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা উদ্বেগজনকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
এছাড়া, প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গুইমারা ও খাগড়াছড়ি সদরসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অবরোধ শিথিল করা হয়েছে। সেনাবাহিনী এবং বিজিবি নানান স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে পরিস্থিতি পুনরায় উত্তপ্ত না হয়। স্থানীয় জনগণ ও সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সংযত আচরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আইএসপিআর এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম বন্ধ করতে সেনাবাহিনী সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তারা নিশ্চিত করেছে, পার্বত্য অঞ্চলের সমস্ত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, শান্তি ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোরভাবে তৎপর থাকবে।
এই ঘটনায় খাগড়াছড়ি অঞ্চলের জনগণ গভীর শোক এবং ভয়ের মধ্যে রয়েছে। নিহতদের পরিবারের পাশে সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসা প্রদানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ তৎপরতা অবলম্বন করছে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান উত্তেজনা এই ধরনের সহিংস ঘটনার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ধরনের পরিস্থিতি পুনরায় না ঘটাতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
স্থানীয় নেতা এবং সমাজকর্মীরা জনগণকে সহিংসতা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে সকলকে সংযত আচরণ করতে হবে। এছাড়া, শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন।
এদিকে, নিহত তিনজনের পরিবার ও স্থানীয় সমাজের মধ্যে গভীর শোক ও হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা আশা করছেন, প্রশাসন দ্রুত এবং যথাযথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধ করবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, খাগড়াছড়িতে রোববার সংঘটিত সহিংসতা ও গুলিতে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা প্রতিফলিত করছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও বিজিবি পরিস্থিতি শান্ত করতে কাজ করছে এবং জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং শিশু ও সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় সকলের যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।