প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে বছরে দুই কোটি ১০ লাখ টনের বেশি খাদ্য নষ্ট হয়, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এই তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, কৃষকের খামার থেকে শুরু করে ভোক্তার টেবিলে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে খাদ্য অপচয় হচ্ছে। সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বাজারজাতকরণ, মূল্য নির্ধারণ বা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আজ সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ‘খাদ্যের অপচয় রোধের মাধ্যমে টেকসই খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করে। সম্মেলনের প্রথম পর্ব সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
ফরিদা আখতার বলেন, বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশে ১ কোটি ৫৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এর অর্থ, দেশের একটি বড় অংশ খাদ্যাভাবে ভুগলেও, অপর অংশে বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় হচ্ছে। তিনি বলেন, “এমন বাস্তবতায় খাদ্য নষ্ট হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং দেশের জন্য বিরাট ক্ষতির বিষয়।”
উপদেষ্টা আরও বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে যেমন দুধ, ডিম, মাংস ও মাছ সবক্ষেত্রেই এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, চান্দিনায় দেখা গেছে, কৃষকেরা দুধ নষ্ট করে ফেলে দিয়েছেন, কারণ পাইকারি ক্রেতারা ন্যায্য দাম দিতে রাজি হয়নি। আলুর ক্ষেত্রেও উৎপাদন বেশি হলেও কৃষকরা উপযুক্ত মূল্য পাননি। এই সব কারণে কৃষকরা উৎপাদিত খাদ্য নষ্ট করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মৎস্যসম্পদ অপচয়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, “ইলিশসহ কিছু মাছ ধরার সময় বিপুল পরিমাণ মাছ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। প্রতিটি নৌযান যে পরিমাণ মাছ ধরে, তার দুই-তৃতীয়াংশই অপচয় হয়। এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই মাছের বেশিরভাগই স্থানীয় বাজারে বিক্রির যোগ্য নয় অথবা জেলেরা তাদের চেনেন না। অবৈধ জাল ব্যবহার ও বাজার সাপোর্টের অভাবের কারণে মাছ ফেলে দিতে হয়। তিনি মনে করেন, জেলেদের সচেতন করে ও রপ্তানি বাজার খুঁজে দিলে এ ধরনের অপচয় হ্রাস করা সম্ভব।
সম্মেলনে ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত পাঁচ দশকে দেশে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হলেও খাদ্য বণ্টনে বৈষম্য রয়ে গেছে। এতে কিছু জনগোষ্ঠী খাদ্য নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “খাদ্য অপচয় রোধ করা না গেলে টেকসই খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি অতি জরুরি।”
সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশে ডেনমার্ক দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আন্দের্স কার্লসেন, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ দিয়া সানু, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এর ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর জেসি উড, এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইয়াসিন উপস্থিত ছিলেন। তারা খাদ্য অপচয় রোধ ও টেকসই খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ফরিদা আখতার আরও বলেন, শুধু শস্য নয়, মাছ ও মাংসের ক্ষেত্রেও অপচয় হচ্ছে। মৎস্য সম্পদ অপচয়ে দেশীয় অর্থনীতি, খাদ্য সরবরাহ চেইন এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, “যে মাছ বাজারে বিক্রি হয় না অথবা চাহিদা অনুযায়ী ধরাই হয় না, সেগুলো নষ্ট হচ্ছে। যদি সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার সংযোগ থাকত, জেলেরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতেন এবং অপচয় হ্রাস পেত।”
উপদেষ্টা খাদ্য অপচয় রোধের জন্য সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া, জনগণকে সচেতন করে খাদ্য অপচয় কমানো সম্ভব।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, যাতে খাদ্য অপচয় রোধ করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে মাছ সংরক্ষণ, মাংস ও দুধের মান নিয়ন্ত্রণ, এবং কৃষক ও জেলেদের বাজার সংযোগ বৃদ্ধি। এছাড়া, সরকারের নীতি অনুসারে খাদ্য সংগ্রহ ও বিতরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সম্মেলনে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়, খাদ্য অপচয় হ্রাসের মাধ্যমে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও মজবুত হবে। খাদ্য অপচয় কমালে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে, বাজারে মূল্য স্থিতিশীল হবে এবং দেশীয় সম্পদের ক্ষয় রোধ হবে।
ফরিদা আখতার বলেন, খাদ্য অপচয় রোধে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। ফ্রিজ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা বৃদ্ধি, সংরক্ষণশীল প্যাকেজিং এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। তিনি বলেন, “যদি আমরা উৎপাদিত খাদ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করি এবং বাজারে পৌঁছে দিই, তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে।”
উপস্থিত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, খাদ্য অপচয় হ্রাসে অভিজ্ঞ দেশগুলোর প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা বাংলাদেশে প্রয়োগ করা সম্ভব। এছাড়া, কৃষি ও মৎস্য খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
সংক্ষেপে, বছরে দুই কোটি টনের বেশি খাদ্য অপচয় এবং দেশের একাংশের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মনোযোগের দাবি রাখে। সরকারের কার্যক্রম, কৃষক ও জেলেদের সচেতনতা, বেসরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা একত্রিত হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং টেকসই খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।










