প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) দীর্ঘদিন ধরে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে এক ‘মৃতপ্রায়’ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেজগাঁওয়ে অবস্থিত এফডিসি কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির স্বতন্ত্র আয় বৃদ্ধি এবং কর্মীদের বেতন-ভাতার সুষ্ঠু প্রদানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দেয়ার পরও কমপ্লেক্সের নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয় ২০২২ সালে।
বর্তমানে এফডিসির আয় গড়ে মাসে মাত্র ২৫ লাখ টাকা। অথচ প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারীরা অবসরে যাচ্ছেন, কেউ মারা যাচ্ছেন—এঁদের অবসরোত্তর ভাতা ও অন্যান্য পাওনা খরচের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। ২০২৩ সালের ২২ এপ্রিল ২৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবসরোত্তর ভাতার ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়। তবে এখনও অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর নগদায়নযোগ্য ছুটি ও অন্যান্য পাওনা প্রায় ১৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই অংক দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম পরিদর্শন শেষে এফডিসিকে ‘কম্পোজিট ফিল্ম সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে নানা প্রণোদনা এখান থেকেই দেওয়া সম্ভব হবে।
ফেব্রুয়ারিতে এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মাসুমা রহমান। তিনি প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, কর্মীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না। তাই তারা কাজের জন্য উৎসাহী নন। সরকারি ঋণ নিয়ে বেতন দেওয়ার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে দুর্বল করেছে। এফডিসির অনুমোদিত জনবল ৫৯১ জন হলেও বর্তমানে মাত্র ১৮৮ জন কর্মরত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি প্রায় ২০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ১১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা অনুদান/থোক বরাদ্দ চেয়েছে, যা মূলত কর্মীদের বেতন, অবসরোত্তর সুবিধা ও আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজন।
এফডিসি কমপ্লেক্সের স্থাপনা তেজগাঁওয়ে ৭ দশমিক ৬৩ একর, ভাষানটেকের ১ একর এবং গাজীপুরের বাংলাদেশ ফিল্ম সিটিতে ১০৫ দশমিক ৫৭৭ একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের ১ দশমিক ৩৭ একর জমিও রয়েছে, কিন্তু শুটিংয়ের জন্য প্রস্তুত হয়নি। প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার নিয়োগে বিলম্ব, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদল এবং করোনা মহামারির কারণে কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি। আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৪৮.৯১ শতাংশ। এপর্যন্ত পাঁচজন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে।
কমপ্লেক্সে থাকবে ছয়টি শুটিং ফ্লোর, ডিজিটাল ভবন, শব্দ ভবন, অফিস ভবন, ঝরনা স্পট, বাগান, খোলা জায়গা, করিডোর এবং ১০টি মেকআপ রুম। এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান জানান, ভাড়া কমিয়ে শুটিং কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। তবে ২০১৬ সালের পর নতুন যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। তাই নির্মাতারা পুরোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে আগ্রহী নন, আর গাজীপুরের ফিল্ম সিটিতেও শুটিং কম হচ্ছে। ফলে আয়ের সম্ভাবনা বাড়ছে না।
অ্যানালগ যুগের ৩৫ মিলিমিটার ফরম্যাটের বিভিন্ন ধরনের কাঁচা ফিল্ম—যেমন সাউন্ড নেগেটিভ, পিকচার নেগেটিভ ও পজিটিভ—আমদানি করে বিক্রি করার একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান ছিল এফডিসি। একসময় এটি লাভজনক ছিল, কিন্তু ডিজিটাল সিনেমার আগমনের পর কাজের সংখ্যা কমে যায়। ২০১৫ সাল থেকে বেতন পরিশোধে প্রায় সম্পূর্ণভাবে সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।
২০১৮ সালে এফডিসিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে এফডিসি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদিত হলেও প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। ২০২৩ সালের আগস্টে কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। কমপ্লেক্সের মূল ভবন ১২ তলা। ১০ তলার ছাদ ঢালাই ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সম্পন্ন হওয়ার কথা।
এফডিসি সূত্র জানিয়েছে, কমপ্লেক্সের নির্মাণ খরচ ৩২২ কোটি ৭৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩৬৫ কোটি ৫১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা হয়েছে। কমপ্লেক্সে থাকবে একটি সিনেপ্লেক্স তিনটি হলসহ, সুইমিং পুল, বেসমেন্ট ও নিচ তলায় প্রায় ৩০০ গাড়ি পার্কিং সুবিধা, তিনটি শুটিং ফ্লোর, ছয়টি মেকআপ রুম, পৃথক এন্ট্রি লবি, রিসেপশন, স্যুভেনির শপ, ফুড কোর্ট, জাদুঘর ও লাইব্রেরি। এছাড়া ডান্সিং ফ্লোর, নাট্যমঞ্চ, শিশুদিবাযত্ন কেন্দ্র, অটিস্টিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের কর্নার, ব্যায়ামাগার, মাল্টিপারপাস হল, ভিএফএক্স স্টুডিওসহ পোস্ট–প্রোডাকশনের আধুনিক সুবিধা থাকবে। দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা, কলাকুশলী ও পর্যটকদের জন্য আবাসিক হোটেল, মিটিং রুম, রেস্টুরেন্ট, ঝরনা ও শিশু খেলার স্থানও থাকবে।
প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান খান জানিয়েছেন, প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার নিয়োগে বিলম্ব, ঘন ঘন বদল, স্থায়ী প্রকল্প পরিচালক না থাকা এবং মহামারি কারণে কাজ সময়মতো শেষ হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও অর্থমূল্য সমন্বয়ের জন্য আদালতে মামলা করে। এসব কারণে প্রকল্পের গতি মন্থর হয়েছে।
ম্যামুনূর রশীদ, এফডিসির পরিচালক (কারিগরি ও প্রকৌশলী) জানান, কমপ্লেক্স যদি সফলভাবে চালু হয়, বছরে ৫২ কোটি টাকা আয় হতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত করতে প্রথমে নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। কর্মীরা এখনও বেতন-ভাতার অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। মাসে বেতন খরচ ৯৭ লাখ টাকা, আর অন্যান্য খরচ মিলে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা।
বছরের পর বছর ধরে স্থবির ও অর্থসংকটে থাকা এফডিসি কমপ্লেক্স যদি ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হয়, তবে এটি শুধু প্রতিষ্ঠানকেই পুনর্জাগ্রত করবে না, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুন মাত্রা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করবে।