প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থায় টিসিবির (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) কার্যক্রম ইতোমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কিছুটা হলেও সহজ করার লক্ষ্যে সরকার টিসিবির মাধ্যমে নানা পণ্য ভর্তুকিমূল্যে সরবরাহ করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার নতুন করে টিসিবির পণ্য তালিকায় যুক্ত হচ্ছে আরও পাঁচটি বহুল ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য। এগুলো হলো চা, লবণ, ডিটারজেন্ট এবং দুই ধরনের সাবান। আগামী নভেম্বর থেকে এই পণ্যগুলো টিসিবির তালিকায় যুক্ত হয়ে বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সভায় তিনি এই ঘোষণা দেন। সভায় টিসিবির উপকারভোগী নির্বাচন ও স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড সক্রিয়করণ বিষয়ক আলোচনা হয়। এতে অংশ নেন ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকগণ, ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী অফিসাররা।
সভায় উপদেষ্টা বলেন, সরকার টিসিবির কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে টিসিবি যে ভর্তুকি দিচ্ছে তার পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যা বাজারের চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্য আনার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন পাঁচটি পণ্য যুক্ত হলে স্বল্প আয়ের মানুষ স্বস্তি পাবে এবং বাজারব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, টিসিবির কার্যক্রম শুধু একটি অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অংশ হিসেবেও কাজ করছে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “স্বল্প আয়ের মানুষেরা যেন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে পারি, তবে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।”
সভায় টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের সর্বশেষ তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এতে জানানো হয়, বর্তমানে সক্রিয় কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ লাখ ৩৪ হাজার ৩১৬টিতে। তবে কার্ড সক্রিয়করণ এবং প্রকৃত উপকারভোগী নির্ধারণ এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, “সঠিক উপকারভোগী শনাক্তকরণই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। এর পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনগুলোর কার্যক্রমে গতি কিছুটা কম রয়েছে।”
বাণিজ্য উপদেষ্টা আগামী এক মাসের মধ্যে সারাদেশে উপকারভোগী নির্বাচন ও কার্ড সক্রিয়করণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, সিটি কর্পোরেশনগুলোর কার্যক্রম দ্রুততর করতে হবে, কারণ শহরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে সভায় অংশ নেওয়া প্রশাসক ও কর্মকর্তারা জানান, টিসিবির কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হলে শুধু পণ্য বিতরণ নয়, বরং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, প্রকৃত দরিদ্ররা কার্ড পেলেও সেটি তারা নিজেরা ব্যবহার করতে পারেন না, বরং দালালচক্র বা মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা ভোগ করে। এ বিষয়ে কঠোর নজরদারির দাবি জানান অংশগ্রহণকারীরা।
টিসিবির কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো প্রতিমাসেই টিসিবির পণ্য কিনে কিছুটা স্বস্তি পান। তবে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সরবরাহে অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক সময় মানুষ অভিযোগ করেন যে, টিসিবির পণ্য তাদের হাতে যথাসময়ে পৌঁছায় না। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নতুন পাঁচটি পণ্য যোগ হওয়ার ফলে তালিকা আরও সমৃদ্ধ হবে এবং এতে টিসিবির কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের ভর্তুকি-ভিত্তিক এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি বয়ে আনলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য আরও বিস্তৃত নীতি প্রয়োজন। তাদের মতে, কেবল টিসিবির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ নয়, বরং কৃষক, উৎপাদক এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে বাজারে দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
উল্লেখ্য, টিসিবি শুরুতে শুধু তেল, চিনি, ডাল ও কিছু মৌলিক খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করলেও এখন ধীরে ধীরে এর পণ্য তালিকা বাড়ানো হচ্ছে। নতুন সংযোজন চা, লবণ, ডিটারজেন্ট এবং সাবান পণ্যগুলো দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সামগ্রী। তাই এগুলো যুক্ত হলে স্বল্প আয়ের মানুষের গৃহস্থালি ব্যয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন যে, নভেম্বর মাস থেকে যখন নতুন পাঁচটি পণ্য বিতরণ শুরু হবে, তখন টিসিবির কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে। তারা মনে করেন, কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির মাধ্যমে এই কার্যক্রম স্বচ্ছ রাখা গেলে প্রকৃত উপকারভোগীরা উপকৃত হবেন এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী হবে।
সবশেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন পুনরায় উল্লেখ করেন, টিসিবির কার্যক্রম শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নয়, বরং এটি সরকারের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি প্রতীক। তার মতে, স্বল্প আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হলে টিসিবির কার্যক্রমকে সঠিকভাবে পরিচালনা এবং ক্রমাগত সম্প্রসারণ করতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা চাই, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যেখানে কোনো মানুষ অনাহারে থাকবে না, কোনো পরিবার সামাজিক নিরাপত্তার বাইরে থাকবে না।”
এভাবে টিসিবির পণ্যের তালিকা সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে সরকারের উদ্যোগ একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি আনবে, অন্যদিকে বাজারে স্থিতিশীলতাও বজায় রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। নভেম্বর থেকে কার্যকর হলে এটি নিঃসন্দেহে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য একটি বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেবে।










