ভারতীয় গজলডোবার পানি ছেড়ে ভাটির লাখো মানুষের জীবন বিপন্ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৪ বার
তিস্তা নদীতে ভারতীয় গজলডোবার পানি ছেড়ে ভাটির লাখো মানুষের জীবন বিপন্ন

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট রোববার সন্ধ্যায় হঠাৎ খুলে দেওয়ায় তিস্তা নদীর তীরবর্তী বাংলাদেশি অঞ্চলগুলোতে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোনও পূর্বনির্ধারিত তথ্য না দিয়ে একাধিক ঘণ্টার মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেওয়ায় লাখো মানুষকে অপ্রস্তুত অবস্থায় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, গজলডোবার উজানের সিকিম, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি অঞ্চলে ভারী বর্ষণের কারণে পানি স্তর বেড়ে যাওয়ায় ভারত এই পানি ছেড়ে দিয়েছে।

রোববার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তার ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপরে পৌঁছায়। রাত ৯টার সময় পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার উপরে এবং রাত ১২টার সময় ৩৫ সেন্টিমিটার ওপরে চলে যায়। সোমবার সকাল ৬টায় পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, এই বৃদ্ধি বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি করেছে এবং পানি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ ঘটনায় লালমনিরহাট, পাটগ্রাম, আদিতমারী, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও সিস্তার তীরবর্তী অঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। রোপা আমন, সবজি, মরিচ ও চিনাবাদামের ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে স্থানীয় কয়েক হাজার পুকুরের মাছও ভেসে গেছে। পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, শ্রীরামপুর, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না ও পাটিকাপাড়া, লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা, রাজপুর, খুনিয়াগাছসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষদের জানানো হয়েছে, রাতভর তারা গবাদিপশু নিয়ে জেগে অবস্থান রেখেছেন।

স্থানীয়রা ভারতকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করছে। গড্ডিমারীর সাবেক স্কুল শিক্ষক শহিদার রহমান বলেন, “গজলডোবা ব্যারাজ বাংলাদেশের মানুষের জন্য বিষফোঁড়া। শুষ্ক মৌসুমে পানি নিয়ন্ত্রণ করে রাখে এবং বর্ষার সময়ে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দিয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করে। এটি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি অমানবিক আচরণ।” দহগ্রামের বাসিন্দা মালেকা বেগম জানান, “রাস্তাঘাট ডুবে গেছে, আমাদের পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। রাতভর গবাদিপশু নিয়ে আতঙ্কে কাটিয়েছি। ভারত পানি ছেড়ে আমাদের দেখছে, আমরা তাদের কাছে কোনো সাহায্য চাইনি।”

আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবরধন গ্রামের বিলকিছ বেগম জানিয়েছেন, “পানি ছেড়ে দেওয়ার খবর পেয়ে আমরা রাতেই স্বামী, সন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে পাশের গ্রামে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের মতো অনেকেই ভয়ঙ্কর রাত কাটিয়েছে।”

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শায়খুল আরিফিন জানান, নদী তীরবর্তী এলাকায় রোপা আমন, চিনাবাদাম ও সবজি চাষ চলছে। যদি পানি তিন থেকে চার দিন স্থায়ী হয়, তাহলে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। তবে এক থেকে দুই দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হবে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার জানিয়েছেন, পানি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার জন্য মাইকিংয়ের মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়েছে। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, “উজান এবং বাংলাদেশের কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। জেলা প্রশাসনের সকল প্রস্তুতি রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।”

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, ভারত দীর্ঘদিন ধরে উজান থেকে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে বাংলাদেশের তিস্তা তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত করে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি ধরে রাখে এবং বন্যা মৌসুমে স্বেচ্ছামূলকভাবে পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবন বিপন্ন করে। এটি শুধু ক্ষয়ক্ষতির বিষয় নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলছে।

উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি পাউবো কর্মীরা পরিস্থিতি মোকাবেলায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হয়েছে। কিন্তু পানি প্রবাহ এতটাই দ্রুত ও বিপুল যে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করে জানিয়েছেন, নদীপাড়ে বসবাসকারীরা বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার ব্যবস্থা নিক, যাতে হঠাৎ প্লাবনের ফলে কোনও প্রাণহানি না ঘটে।

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় মানুষদের জীবন অতিশয় বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। রাতভর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। কৃষি জমি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় দোকানপাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমও প্রভাবিত হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতি প্রতি বছর 반복 হওয়ায় নদী তীরবর্তী এলাকাবাসী দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজান ও ব্যারাজ নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা না থাকলে এবং আগাম সতর্কতা না দিলে বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের কার্যক্রমকে মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত নয় বলে বিবেচনা করা হয়।

উপসংহারে, গজলডোবা ব্যারাজ থেকে ভারতীয় পানি ছেড়ে দেওয়া নিয়ে তিস্তা তীরবর্তী লাখো মানুষ এই মুহূর্তে বিপদাপন্ন। পানি বৃদ্ধি ও তীব্র বৃষ্টিপাতের কারণে লাখো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানো, কৃষি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় প্রশাসন তৎপর রয়েছে। তবে স্থানীয় জনগণ ও কৃষকরা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সমাধান ও নদী নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা চাচ্ছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত