দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে আবার গতি পেল সিরাজগঞ্জ–বগুড়া রেললাইন প্রকল্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫২ বার

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বছরের পর বছর স্থবিরতার পরে অবশেষে আবার গতি ফিরে এসেছে সিরাজগঞ্জ–বগুড়া ডুয়েল গেজ রেলপথ প্রকল্পে। দীর্ঘদিন ধরে এই বহুল প্রত্যাশিত রেললাইন নির্মাণ কাজ নানা কারণে থমকে ছিল। ভূমি অধিগ্রহণে সরকারের নতুন অর্থ বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণের ফলে প্রকল্পটি আবার বাস্তবায়নের পথে প্রবেশ করেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, রেলপথ চালু হলে ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সংযোগ আরও সহজ হবে এবং দূরত্ব কমে যাবে প্রায় ১১২ থেকে ১৩০ কিলোমিটার। এর ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় সাশ্রয় হবে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও গতি আসবে।

২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেকে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটি শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুনে। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ ও নকশা চূড়ান্তকরণে বিলম্ব হওয়ায় বাস্তবায়ন স্থবির হয়ে পড়ে। এর ফলে রেলপথের সুফল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন বিলম্বিত হয়।

প্রকল্পের পুনরায় গতিশীলতার প্রধান কারণ ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সরকারের ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার নতুন বরাদ্দ। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ অংশের ৪২০ একর জমির জন্য প্রায় ৯৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম জানান, প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয়েছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৯৬০ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

নির্মাণকাজের আওতায় বগুড়ার ছোট বেলাইল থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম. মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত ৭৩ কিলোমিটার নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি কাহালু থেকে রাণীরহাট পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার একটি সংযোগ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে নতুন জংশন তৈরি হবে। মোট নয়টি নতুন স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে শেরপুর, আড়িয়া বাজার, ছোনকা, চান্দাইকোনা, রায়গঞ্জ ও কৃষ্ণদিয়া উল্লেখযোগ্য।

প্রকল্প পরিচালক মনিরুল ইসলাম ফিরোজী জানান, প্রকল্পটি আগে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় ছিল। তবে ভারতীয় পক্ষের অনাগ্রহের কারণে এটি এখন সেই তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে কাজ দ্রুত শুরু হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিকরা মনে করছেন, রেলপথ চালু হলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে। সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, “রেলপথটি চালু হলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে, সময় ও খরচ দুটোই কমবে। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

বর্তমানে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার মধ্যে ট্রেনগুলো সান্তাহার, নাটোর ও ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার পথ ঘুরে চলাচল করে। নতুন রেললাইন চালু হলে যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের সময়, অর্থ এবং ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। যাত্রীদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে যাতায়াত করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ও খরচের সঙ্গে সঙ্গে যাতায়াতের অসুবিধা ছিল। নতুন রেললাইন চালু হলে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে সমাধান হবে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে শুধুমাত্র যাত্রী সুবিধা নয়, বরং কৃষি ও শিল্পপণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন, কারখানা এবং ব্যবসা কেন্দ্রগুলো থেকে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পণ্য দ্রুত এবং কম খরচে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নতুন উদ্দীপনা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ–বগুড়া রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। এটি শুধু যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সহজ করবে না, বরং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশের নতুন দিগন্ত খুলবে। স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাঙ্গন, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভোগান্তি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর এই রেললাইন প্রকল্পের পুনরায় গতিশীলতা উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে নতুন আশা যোগাচ্ছে। এটি শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং এলাকার অর্থনীতি, সামাজিক জীবন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি বহন করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণ মিলিতভাবে প্রকল্পটির ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন এবং সুফলের অপেক্ষায় রয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত