জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন সর্বজনীন করতে প্রয়োজন আইন সংস্কার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৯ বার

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, ঢাকা। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভোটাধিকারের মতো মৌলিক নাগরিক অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, বাজেট বণ্টন এবং সুশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও মূলত কিছু আইনি দুর্বলতা এই লক্ষ্য পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

সোমবার জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস ২০২৫ উপলক্ষে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর সহযোগিতায় প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন: অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ওয়েবিনারে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধনের হার মাত্র ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যুনিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে বৈশ্বিক গড় যথাক্রমে ৭৭ ও ৭৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা ইতিমধ্যে প্রায় সর্বজনীন নিবন্ধন নিশ্চিত করেছে, যেখানে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

নিউইয়র্কে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বেলজিয়ামের রানিসহ শীর্ষ কূটনীতিক ও নেতৃবৃন্দের বৈঠক

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ দ্রুত সংশোধন করে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে আইনগতভাবে নিবন্ধনের দায়িত্ব প্রদান করা গেলে এই অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে। সংশোধনের ফলে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় জন্ম নেওয়া প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধনের আওতায় আসবে। মৃত্যুনিবন্ধন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে উত্তরাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নারীর অধিকার সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে। এছাড়া জন্ম ও মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন সনদের ভুল সংশোধনের আবেদনের ফি মওকুফ এবং নিবন্ধন তথ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে ‘ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রস্তুত বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

ওয়েবিনারে জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, “আইন সংস্কারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের দায়িত্ব দিলে ২০৩০ সালের মধ্যে সবাইকে নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এটি এসডিজি’র ১৬.৯ লক্ষ্যমাত্রা- জন্মনিবন্ধনসহ সবার জন্য বৈধ পরিচয়পত্র প্রদান অর্জনে সহায়ক হবে।”

ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আইন সংশোধনের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কার্যকর বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিবন্ধন বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি, জনবল ঘাটতি দূরীকরণ, প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান, প্রক্রিয়াগত জটিলতা হ্রাস এবং সংশ্লিষ্ট সকল খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন একটি দেশের নাগরিক অধিকার এবং সুশাসনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ওয়েবিনারে আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান। ওয়েবিনারে প্রিন্ট, টেলিভিশন এবং অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন। প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের ওয়েবিনারের সভাপতিত্ব করেন, আর মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন সংগঠনের কো-অর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন।

বক্তারা বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শুধু নাগরিক অধিকার সুরক্ষা নয়, বরং এটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। জন্মনিবন্ধন সঠিকভাবে নিশ্চিত করলে শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে। একইভাবে মৃত্যুনিবন্ধন সঠিকভাবে নিশ্চিত করলে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা, পেনশন বা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা প্রদান এবং নারীর অধিকার সুরক্ষা সহজতর হবে।

বিশেষজ্ঞরা ওয়েবিনারে এই বিষয়টিও উল্লেখ করেন যে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জটিলতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও দ্রুততর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ডিজিটাল নিবন্ধন, মোবাইল-ভিত্তিক আবেদন, অনলাইন যাচাই এবং ডেটাবেস সংযোগ নিশ্চিত করা হলে দেশের সব নাগরিককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধন করা সম্ভব।

ওয়েবিনারে উপস্থিত নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা না হলে আইন সংস্কার একা যথেষ্ট হবে না। তাই বিভিন্ন মিডিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নিবন্ধনের গুরুত্ব ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাতে হবে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিবন্ধনের দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ত্বরান্বিত করতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাবও ওয়েবিনারে উঠে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এককভাবে কোন খাত কার্যকরভাবে নিবন্ধন নিশ্চিত করতে পারবে না, তাই সমন্বিত নীতি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অপরিহার্য।

ওয়েবিনারে প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, “জনগণের জন্য জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সুরক্ষিত করা আমাদের সমষ্টিগত দায়িত্ব। এটি শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মূল স্তম্ভ। আইন সংস্কার এবং সুশৃঙ্খল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে পারব।”

আলোচকরা আরও বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করা হলে দেশের নীতি প্রণয়নকারীরা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এটি স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষা খাত, সামাজিক সুরক্ষা, বাজেট বণ্টন এবং দারিদ্র্য বিমোচন প্রভৃতি ক্ষেত্রে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক হবে।

ওয়েবিনার শেষাংশে বক্তারা সাধারণ জনগণ, বিশেষজ্ঞ, মিডিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তারা বলেন, “জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়, এটি দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। সবাইকে এই উদ্যোগে সমর্থন দিতে হবে।”

উপসংহারে বলা যায়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কারের মাধ্যমে সবার জন্য স্বচ্ছ ও সহজলভ্য নিবন্ধন নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি শুধু নাগরিক অধিকার রক্ষা নয়, বরং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। ওয়েবিনারে উঠে আসা প্রস্তাব এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত দেশের নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত