কুমিল্লা নয়, নোয়াখালী বিভাগ চাই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৫ বার
কুমিল্লা নয়, নোয়াখালী বিভাগ চাই

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে নতুন বিভাগ ঘোষণা নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই কুমিল্লাকে বিভাগ করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নোয়াখালীবাসীর স্পষ্ট আপত্তি সামনে এসেছে। ঢাকাস্থ নোয়াখালী জেলা সমিতি সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবের অডিটোরিয়ামে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছে, কুমিল্লাকে বিভাগ ঘোষণা করা হলে তা নোয়াখালীবাসী মেনে নেবে না। তারা যুক্তি দেখিয়েছে, নোয়াখালী ইতিহাস, আয়তন, অর্থনীতি, সমুদ্রবন্দর এবং রাজনৈতিক অবদানের দিক থেকে কুমিল্লার চেয়ে এগিয়ে, তাই নতুন বিভাগ হলে সেটি অবশ্যই নোয়াখালীকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতুল্লাহ বুলু নোয়াখালীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, “নোয়াখালী জেলার আয়তন ২,০০০ কিলোমিটার, এখানে সমুদ্রবন্দর হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্নে নোয়াখালীর নেতারা প্রথম সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সিরাজুল আলম খান না থাকলে হয়তো বাংলাদেশের জন্মই হতো না। আ স ম আব্দুর রব স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছেন। প্রথিতযশা সাংবাদিক থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ—অনেকেরই শিকড় নোয়াখালীতে।” তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর প্রথম জেলা কমিটি গঠিত হয়েছিল নোয়াখালী জেলা সমিতির মাধ্যমে। তাই নোয়াখালীকে বিভাগ করার দাবি যৌক্তিক।

বিএনপির এই শীর্ষ নেতা পরিষ্কার করে বলেন, তাদের দল ক্ষমতায় থাকাকালে সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহকে বিভাগ করা হয়েছিল জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে। বর্তমান সময়ে সেই গুরুত্ব নোয়াখালীর। বিএনপি যদি আবার ক্ষমতায় আসে তবে তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে নোয়াখালীকে বিভাগ ঘোষণা করা। বরকতুল্লাহ বুলু আরও যোগ করেন, “বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাড়িও বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে। নোয়াখালীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, এখন সময় এসেছে তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার।”

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকাস্থ নোয়াখালী জেলা সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক সচিব কেএম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, “নোয়াখালী জেলার রয়েছে প্রায় তিন হাজার বছরের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। আয়তনে এটি কুমিল্লার চেয়ে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার বড় এবং জনসংখ্যায়ও এগিয়ে, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বসবাস করছে। এখানে সরকারের নানা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর রয়েছে, নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দর গড়ে উঠছে। নীল অর্থনীতি তথা ব্লু ইকোনমির গুরুত্বপূর্ণ অংশও নোয়াখালীর সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নোয়াখালীর শিল্পপতিদের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ।”

তিনি আরও বলেন, নোয়াখালীতে দেশের নামকরা রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও শিল্পপতিদের বসবাস, যা জেলা হিসেবে এর মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়েছে। তাই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নোয়াখালীর অবদানকে মূল্যায়ন করতে হলে নোয়াখালীকে বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করাই হবে সময়োপযোগী ও যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত।

অনুষ্ঠানে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মাবুদের সঞ্চালনায় বিএনপি, জামায়াত, গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই একবাক্যে নোয়াখালীকে বিভাগ করার পক্ষে মত দেন এবং কুমিল্লাকে বিভাগ করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

নোয়াখালী জেলা সমিতির নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, তারা কেবলমাত্র প্রশাসনিক বিভাজনের যুক্তি নয়, বরং ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি এবং রাজনীতিতে নোয়াখালীর অবদানের ওপর ভিত্তি করে তাদের দাবি উপস্থাপন করছেন। তাদের মতে, কুমিল্লাকে বিভাগ করার যে প্রস্তাব সরকারিভাবে আলোচিত হচ্ছে, সেটি মূলত রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং জনগণের স্বার্থ ও বাস্তবতাকে উপেক্ষা করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভাগ গঠনের ক্ষেত্রে শুধু ভৌগোলিক অবস্থান বা প্রশাসনিক সুবিধা নয়, বরং জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক অবদান এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া উচিত। নোয়াখালী সেই দিক থেকে একেবারেই পিছিয়ে নেই, বরং অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে। বিশেষ করে সমুদ্রবন্দর ও ব্লু ইকোনমি নিয়ে সরকারের যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে, সেখানে নোয়াখালীর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে নোয়াখালীবাসীর এই দাবি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তব প্রয়োজনে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তারা মনে করেন, নোয়াখালীকে বিভাগ করলে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় প্রশাসনিক চাপ অনেকটা লাঘব হবে, পাশাপাশি উপকূলীয় অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।

অন্যদিকে কুমিল্লাকে বিভাগ করার যুক্তির পক্ষে থাকা একটি মহল বলছে, কুমিল্লা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। তবে নোয়াখালী জেলা সমিতির শক্ত অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে যদি কেবল কুমিল্লাকে কেন্দ্র করে বিভাগ ঘোষণা করা হয় তবে সেটি বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কোন দিক বেছে নেবে। কুমিল্লা নাকি নোয়াখালী—কে হবে দেশের পরবর্তী প্রশাসনিক বিভাগ? নোয়াখালী জেলা সমিতির ঘোষণা স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা নিজেদের দাবি থেকে কোনোভাবেই সরে আসবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত