বিসিবির নতুন কমিটির প্রথম সভা আজ: ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ গঠনে আলোচনার বড় মঞ্চ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৫ বার

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন কমিটির দায়িত্ব নেওয়ার পর আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সভা। এ সভাকে ঘিরে ক্রিকেটাঙ্গনে এখন চরম আগ্রহ ও প্রত্যাশা। কারণ, এই সভায় আলোচনা হবে এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে যা বাংলাদেশ ক্রিকেটের আগামী দিনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ঘরোয়া ক্রিকেট সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন, কোচিং কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং দীর্ঘমেয়াদি গেম ডেভেলপমেন্ট পরিকল্পনা—সবই রয়েছে আজকের আলোচ্যসূচিতে।

নতুন সভাপতি আমিনুল ইসলাম চার মাস আগেও নিজেকে “একটি দ্রুত টি-টোয়েন্টি ইনিংসের খেলোয়াড়” হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু সোমবার দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার বক্তব্য ছিল ভিন্ন—এবার তিনি বললেন, “আমি এখন একটি টেস্ট ইনিংস খেলতে চাই।” এই উক্তির মধ্য দিয়েই যেন তিনি স্পষ্ট করে দিলেন, বিসিবির নেতৃত্বে তিনি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকেই নজর দিচ্ছেন।

অমিনুল ইসলাম, যিনি আগে আইসিসিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, জানিয়েছেন যে তিনি গেম ডেভেলপমেন্টের প্রেমে পড়ে গেছেন এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়নের এই যাত্রা তার কাছে শুধু দায়িত্ব নয়, এক গভীর আবেগের বিষয়। তার ভাষায়, “ক্রিকেট একটা আমানত, আমরা সেটা পেয়েছি জাতির কাছ থেকে। সেই আমানত যেন সম্মান রক্ষা করে এগিয়ে নিতে পারি, সেটাই এখন মূল লক্ষ্য।”

অমিনুলের সঙ্গে এই নেতৃত্বের দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন সাবেক অধিনায়ক ও এখনকার সহসভাপতি ফারুক আহমেদ। দুজনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন—যেখানে আমিনুল ইসলাম সভাপতি এবং ফারুক আহমেদ সহসভাপতি। বিস্ময়করভাবে, দুজনই একে অপরের প্রস্তাবক এবং সমর্থক ছিলেন। ফলে এই নতুন জুটিকে ঘিরে ক্রিকেট মহলে দেখা যাচ্ছে এক ধরণের ইতিবাচক প্রত্যাশা—দুজন অভিজ্ঞ ক্রিকেট ব্যক্তিত্বের একত্রে কাজ করার সম্ভাবনা দেশের ক্রিকেটে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

সোমবার সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারা। সেই অনুষ্ঠানে আমিনুল বলেন, “আমি আইসিসির চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেবায় এসেছি। আমার মনোযোগ এখন কেবল দেশের ক্রিকেট উন্নয়নে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা ক্রিকেটকে পেশা নয়, এক ধরনের জাতীয় দায়িত্ব হিসেবেই দেখছি। এটা অনারারি পদ, তবুও এই দায়িত্ব নেওয়াকে আমি গর্বের বিষয় মনে করি।”

আজকের সভায় যে বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে, তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হবে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো সংস্কার। দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া লিগে দলগুলোর মান, খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক, মাঠের অবস্থা এবং টুর্নামেন্ট পরিচালনায় নানা সমস্যা বিরাজ করছে। নতুন বোর্ড চায়, এসব সমস্যা নিরসনে একটি স্থায়ী সমাধান কাঠামো গড়ে তোলা। বিশেষ করে বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করা এবং তরুণ প্রতিভা আবিষ্কারের জন্য উন্নত ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রাম চালু করা হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এছাড়া নতুন কোচিং কাঠামো নিয়েও আলোচনা হবে সভায়। বাংলাদেশের জাতীয় দলে কোচিং স্টাফ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ের ব্যর্থতার পর থেকে। বোর্ড চাইছে, নতুন করে কোচদের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি পুনর্নির্ধারণ করা হোক, যাতে দেশীয় কোচদেরও বেশি সুযোগ দেওয়া যায়। একইসঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কোচিং একাডেমিগুলোর কার্যক্রম কীভাবে আরও ফলপ্রসূ করা যায়, সেটিও আলোচনার অন্যতম বিষয়।

সভায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়েও বিস্তর আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ক্রিকেট একাডেমি প্রতিষ্ঠা, বিদ্যমান স্টেডিয়ামগুলোর সংস্কার এবং অনুশীলন মাঠের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বোর্ড। বিশেষ করে সিলেট, খুলনা এবং কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের সুবিধাসম্পন্ন কেন্দ্র স্থাপন করার প্রস্তাব আজকের বৈঠকে উত্থাপন করা হতে পারে।

আমিনুল ইসলাম এই বিষয়ে আগেই জানিয়েছিলেন, “আমরা শুধু জাতীয় দল নয়, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ক্রিকেটের ভিত্তি শক্তিশালী করতে চাই। গ্রাসরুট লেভেল থেকেই প্রতিভা তুলে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।” তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে যখন দেশের প্রতিটি জেলার শিশুরাও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পাবে।

অন্যদিকে সহসভাপতি ফারুক আহমেদ বলেছেন, “আমরা অতীতের বিরোধ বা বিভাজন নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চাই। বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়ে নিতে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ছোট ছোট ভুলত্রুটি এড়িয়ে একটি বড় লক্ষ্য অর্জনই আমাদের উদ্দেশ্য।”

নতুন বোর্ডের মেয়াদ চার বছর। তবে বিসিবির এবারের নির্বাচনে কিছু বিতর্কও ছিল। বোর্ডের ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার ভোট প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও নতুন সভাপতি আমিনুল বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য না করে বলেছেন, “আমাদের সামনে এখন অনেক কাজ, আমরা চাই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে।”

আজকের সভায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ২৩টি বিভাগ ও অঞ্চলকে ২৫ জন পরিচালকের মধ্যে কীভাবে ভাগ করা হবে, তা নির্ধারণ করা। এটি বিসিবির প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। নতুন নেতৃত্ব চায় এই দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে।

ক্রিকেট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিসিবির নতুন কমিটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব জাতীয় দলের পারফরম্যান্সেও প্রভাব ফেলেছে। তাই আজকের সভা কেবল একটি প্রশাসনিক বৈঠক নয়, বরং এটি হতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণের এক সূচনা।

বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন তাকিয়ে আছেন এই নতুন নেতৃত্বের দিকে। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে উত্থান-পতন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশেষ করে আইসিসি টুর্নামেন্টগুলোতে দলীয় পারফরম্যান্সের অনিশ্চয়তা, ব্যাটিংয়ের ভঙ্গুরতা এবং কোচিং স্টাফের ঘনঘন পরিবর্তন বোর্ডের ওপর প্রশ্ন তুলেছে। নতুন কমিটি এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে পারবে কি না, সেটাই এখন সময়ের অপেক্ষা।

বিসিবির ইতিহাসে আগেও দেখা গেছে, নতুন নেতৃত্ব অনেক আশাবাদ নিয়ে আসে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্দীপনা হারিয়ে যায়। তবে আমিনুল ও ফারুকের জুটি ক্রিকেটবিশ্বে ভিন্ন এক বার্তা দিতে পারে। তাদের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং গেম ডেভেলপমেন্টে গভীর আগ্রহ হয়তো বাংলাদেশের ক্রিকেটে এনে দিতে পারে নতুন দিগন্ত।

সকালে বোর্ডের সভা শুরু হওয়ার আগেই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বেশ সরব পরিবেশ দেখা গেছে। কর্মকর্তারা, প্রাক্তন ক্রিকেটার, মিডিয়া প্রতিনিধি—সবাই অপেক্ষায় আছেন নতুন বোর্ডের প্রথম সিদ্ধান্তগুলোর জন্য। ক্রিকেট ভক্তদের আশা, এই সভা শুধু আনুষ্ঠানিকতাই নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

একজন সাবেক ক্রিকেটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমিনুল ভাই মাঠে যেমন পরিশ্রমী ছিলেন, বোর্ডেও তেমনই হবেন বলে বিশ্বাস করি। সময় এসেছে বাস্তব উন্নয়নের।”

আজকের সভা শেষ হলে বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পরিকল্পনার রূপরেখা প্রকাশ করতে পারে। তবে এক কথায় বলা যায়, বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন এক নতুন অধ্যায়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, আর সেই অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠা লেখা শুরু হচ্ছে আজকের এই সভাতেই

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত