প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের তৃতীয় রাউন্ডে আবারও দুঃখের গল্প লিখল বাংলাদেশ ফুটবল দল। টানটান উত্তেজনায় ভরা ম্যাচে শেষ মুহূর্তে হংকং-চায়নার গোলে ৪-৩ ব্যবধানে হারতে হয়েছে লাল-সবুজদের। জয়ের স্বপ্ন যখন ধীরে ধীরে বাস্তব হয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই প্রতিপক্ষের ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত ফরোয়ার্ড রাফায়েল মার্কিসের হ্যাটট্রিক বাংলাদেশের সব আশা নিভিয়ে দেয়।
বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় স্টেডিয়ামে ‘সি’ গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে শুরুটা ছিল বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক। ম্যাচের মাত্র ১৩ মিনিটেই ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের ফাউলের ফলে পাওয়া ফ্রি-কিক থেকে দারুণ এক গোল করেন হামজা। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া জোরালো শটে হংকং চায়নার ডিফেন্ডার ম্যাট ওরের মাথায় হালকা লেগে বলটি জালে জড়ায়। গোলটি বাংলাদেশকে এগিয়ে দেয় এবং দর্শকদেওয়ালে দেখা যায় উল্লাসের ঢেউ।
এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে হামজার দ্বিতীয় গোল। এর আগে জুন মাসে একই মাঠে ভুটানের বিপক্ষে নিজের প্রথম গোলটি করেছিলেন তিনি। জাতীয় দলে মাত্র চতুর্থ ম্যাচ খেলেই এমন ধারাবাহিক পারফরম্যান্স হামজাকে দলের অন্যতম ভরসায় পরিণত করছে।
তবে প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের আনন্দে ধাক্কা লাগে। যোগ করা সময়ে সেট পিস থেকে সমতা ফেরায় হংকং-চায়না। ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত এভারটন কামারগোর নিখুঁত শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে ম্যাচে ফিরে আসে অতিথিরা। ফলে বিরতিতে দুই দল ১-১ গোলে সমতায় যায়।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গতি পায় ম্যাচ। বিরতি শেষে মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় বদলি হিসেবে মাঠে নেমে গোল করেন রাফায়েল মার্কিস। তাঁর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন হয়ে যায় ২-১। এর পর থেকেই বাংলাদেশের রক্ষণে দেখা যায় এলোমেলো অবস্থা। কোচ হাভিয়ের কাবরেরা দ্রুত তিনটি পরিবর্তন আনেন—সোহেল রানা সিনিয়র, সোহেল রানা জুনিয়র ও ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের জায়গায় মাঠে নামানো হয় সামিত সোম, জামাল ভূঁইয়া ও ফাহামেদুলকে। কিন্তু তাতে ছন্দ ফেরে না লাল-সবুজদের খেলায়।
৭৪ মিনিটে আবারও গোল করেন মার্কিস, এবার হেডে। ফলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-১। তখন মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশের আর ফেরার উপায় নেই। তবে ৮৪ মিনিটে নতুন নাটকীয়তা তৈরি হয়। হংকং গোলরক্ষকের বড়সড় ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করেন তরুণ শেখ মোরছালিন। গোলটি যেন দলকে নতুন করে জ্বালিয়ে দেয়। দর্শক গ্যালারি আবারও আশায় ফেটে পড়ে।
এরপর যোগ করা সময়ের নবম মিনিটে মাঠে নামা সামিত সোমের দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে ম্যাচে সমতা আসে (৩-৩)। বাংলাদেশ তখন পুরোপুরি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। সবাই বিশ্বাস করছিল, হয়তো ঐতিহাসিক এক ড্র বা অবিশ্বাস্য এক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়বে জামাল ভূঁইয়ারা। কিন্তু ভাগ্য আবারও প্রতিপক্ষের পক্ষে। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে রাফায়েল মার্কিস তার হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ ঘটান।
শেষ বাঁশি বাজতেই হতাশার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মুখে। মাঠে নেমে যারা সর্বস্ব উজাড় করে খেলেছে, তারা বুঝে গেল — আরেকটি লড়াই শেষ হলো বেদনায়। এই হারের ফলে এশিয়ান কাপের মূলপর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের। তিন ম্যাচে মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে ‘সি’ গ্রুপের তলানিতে অবস্থান করছে হাভিয়ের কাবরেরার শিষ্যরা।
বাংলাদেশ ফুটবলের এই পরাজয় কেবল একটি ম্যাচের হার নয়, বরং বহু বছরের প্রত্যাশার আরেকটি স্থগিত অধ্যায়। তবুও মাঠে হামজা, মোরছালিন ও সামিতের মতো তরুণদের প্রাণবন্ত পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের আশা জাগাচ্ছে। কিন্তু এখনো বড় দলের সঙ্গে কৌশলগত ঘাটতি, রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং শেষ মুহূর্তে মনোযোগ হারানোর প্রবণতা দলটিকে পিছিয়ে রাখছে।
যে ম্যাচে জয়ের স্বপ্ন এতটা কাছে এসেছিল, সেখানে শেষ মুহূর্তে পরাজয় যেন বুকে ছুরির মতো লাগে। তবে এই হারও শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে—যদি দলটি এই ভুল থেকে শিক্ষা নেয়, হয়তো ভবিষ্যতের কোনো ম্যাচে এমন নাটকীয়তা সুখের গল্প হয়ে উঠবে।