আমাদের সেফ এক্সিটের দরকার নেই: আসিফ নজরুল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
আমাদের সেফ এক্সিটের দরকার নেই: আসিফ নজরুল

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক / একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ–২০২৫ নিয়ে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় দেশজুড়ে আলোচিত ‘সেফ এক্সিট’ প্রসঙ্গকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তাঁর মতে, উপদেষ্টাদের জন্য কোনো ‘সেফ এক্সিট’ দরকার নেই, বরং ভয়াবহ ও অকার্যকর রাষ্ট্রকাঠামো থেকেই জাতির সেফ এক্সিট প্রয়োজন।

শনিবার সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত এই জাতীয় পরামর্শ সভায় অংশ নেন সরকারের একাধিক উপদেষ্টা, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি। আলোচনার মূল বিষয় ছিল নব প্রণীত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ–২০২৫-এর প্রয়োগযোগ্যতা, বাস্তব চ্যালেঞ্জ এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা। কিন্তু আলোচনার একপর্যায়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার প্রসঙ্গ উঠে এলে ড. আসিফ নজরুল তাঁর বক্তব্যে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে যারা সেফ এক্সিট নিয়ে আলোচনা করছেন, তারা হয়তো বুঝে বা না বুঝেই এমন একটি ধারণা তৈরি করছেন যে, এই দেশকে বাঁচাতে উপদেষ্টা বা নেতৃত্বের জন্য কোনো পালানোর পথ থাকা দরকার। কিন্তু আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমাদের কারো সেফ এক্সিটের প্রয়োজন নেই। আমরা এখানে দায়িত্ব নিতে এসেছি, পালিয়ে যেতে নয়।”

তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট দৃঢ়তা ছিল যখন তিনি যোগ করেন, “এই দেশ যে অসুস্থ কাঠামোর মধ্যে পড়ে গেছে, সেখান থেকেই জাতির সেফ এক্সিট দরকার। গত পঞ্চান্ন বছরে আমরা যা দেখেছি তা ভয়াবহ—বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতিতে পঙ্গু প্রশাসন, ব্যাংক লুট, সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তাহীনতা, আরেকটি প্রজন্মের হতাশা। আমরা এমন এক রাষ্ট্র তৈরি করেছি, যা নিজেই নিজের শত্রু হয়ে উঠেছে। এখন সময় এসেছে, এই রাষ্ট্রকাঠামোকে সুস্থ পথে ফেরানোর।”

সভায় উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং শিল্প বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি ও মানবাধিকার কর্মীরা। তাঁরা সবাই মানবাধিকার কমিশনের নতুন অধ্যাদেশের আলোকে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে মত দেন।

তবে সভার মূল আকর্ষণ ছিল ড. আসিফ নজরুলের বক্তৃতা। তিনি দৃঢ় ভাষায় বলেন, “আমরা যারা আজ এই অবস্থানে আছি, আমাদের সবারই একটি নৈতিক দায়িত্ব আছে—রাষ্ট্রকে তার সঠিক পথে ফেরানো। আমরা এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছি, যেখানে আইনের চেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির কথাই বেশি কার্যকর। যেখানে জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ, সাংবাদিকেরা ভয়ে কথা বলতে পারেন না, আর প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভুত্বে নতজানু। এমন পরিস্থিতি থেকে জাতির মুক্তি পেতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সত্যিকারের মানবিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা।”

তিনি বলেন, “মানবাধিকার কমিশন যদি কেবল রিপোর্ট লেখার প্রতিষ্ঠান হয়, তাহলে এর কোনো অর্থ নেই। আমাদের এমন একটি কমিশন দরকার, যেটি সরকারের ওপরও নজরদারি রাখতে পারে, নাগরিকের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। আমরা যেভাবে মানবাধিকারের কথা বলি, তাতে অনেক সময় জনগণের কষ্টের জায়গাগুলো হারিয়ে যায়। অথচ রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত জনগণ, তাদের মর্যাদা ও ন্যায্যতা।”

ড. নজরুলের এই বক্তব্যে সভায় উপস্থিত অনেকেই গভীর মনোযোগে শোনেন। কেউ কেউ মাথা নেড়ে সম্মতি জানান, আবার কেউ কেউ তাঁর মন্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা শুরু করেন। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ‘সেফ এক্সিট’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন মহলে এটি সরকারের পরিবর্তন, রাজনৈতিক স্থানান্তর কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু আসিফ নজরুলের ব্যাখ্যা এই শব্দটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ দিয়েছে—এটি এখন জাতির বেঁচে থাকার পথ হিসেবে উঠে এসেছে।

বক্তৃতার শেষাংশে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ আজ এমন এক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সত্য বলা বিপজ্জনক, ভিন্নমত প্রকাশ করা অপরাধ। কিন্তু যদি কেউ সত্যকে ভয় পায়, তাহলে সেই জাতি কখনো মুক্ত হতে পারে না। আমাদের প্রয়োজন নতুন এক পথ—যেখানে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা এই রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে।”

সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. আসিফ নজরুল আরও বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, এই দেশকে নতুনভাবে গড়ার সময় এসেছে। যদি আমরা নিজেদের সংস্কার না করি, তাহলে আরেকটি প্রজন্ম আমাদের ব্যর্থতার দায় বইবে। সেই কারণেই আমি বলেছি—আমাদের নয়, জাতির সেফ এক্সিট দরকার।”

পরামর্শ সভার সার্বিক আলোচনায় উঠে আসে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ–২০২৫ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। উপস্থিত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ এই অধ্যাদেশকে মানবাধিকার রক্ষার এক নতুন অধ্যায়ে পরিণত করবে, যেখানে নাগরিক স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত মাপকাঠি।

সভা শেষে উপস্থিত মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, আসিফ নজরুলের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এটি এক ধরনের প্রতিবাদ, এক ধরনের আহ্বান—যেখানে বলা হয়েছে, পালানোর নয়, দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে।

রাজধানীর সেই সভাকক্ষে উপস্থিত অনেকেই অনুভব করছিলেন, এই বক্তব্য কেবল এক উপদেষ্টার মতামত নয়, এটি যেন এক জাতির আত্মসমালোচনার প্রতিধ্বনি। বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিচারহীনতার যে চক্র বহুদিন ধরে চলছে, সেই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাচ্ছেন তিনি। তাঁর কথায় যেন প্রতিফলিত হচ্ছিল সেই জনগণের মনের কথা, যারা আজও বিশ্বাস করে—এই দেশ এখনো বাঁচানো সম্ভব, যদি কেউ সাহস করে সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়।

এমন এক সময়, যখন ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে নানা জল্পনা, গুজব ও রাজনৈতিক কৌশল ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন আসিফ নজরুলের বক্তব্য একটি নতুন ভাবনার দিক খুলে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের দরকার নয় নিরাপদ প্রস্থান, দরকার নিরাপদ রাষ্ট্র।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত