ড. ইউনূসের বারবার বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন তুললেন রনি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪০ বার
ড. ইউনূসের বারবার বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন তুললেন রনি

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক ঘনঘন বিদেশ সফর নিয়ে দেশের রাজনীতি ও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এ ধরনের সফর প্রয়োজনীয়, আবার অনেকে মনে করছেন, দেশের ভেতরে নানা সংকটের সময় সরকারপ্রধানের এভাবে ঘনঘন বিদেশে অবস্থান রাজনৈতিকভাবে যথাযথ নয়। এই বিতর্কে যুক্ত হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি।

সম্প্রতি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণমূলক ভিডিওতে গোলাম মাওলা রনি বলেন, “দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার বারবার বিদেশ সফর কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত একাধিকবার বিদেশ সফর করেছেন, যা অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার এই সময়ে তাঁর বিদেশে ঘনঘন থাকা স্বাভাবিকভাবেই নাগরিকদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছে।”

রনি আরও বলেন, “একটা সময় শেখ হাসিনার কঠোর সমালোচনার পরও আন্তর্জাতিক মহলে ড. ইউনূস বেশ সুনাম ও সমর্থন অর্জন করেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর কিছু বক্তব্য ও কার্যক্রম জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে তার সরকার খাওয়াচ্ছে—যা অতীতে শেখ হাসিনা ব্যবহার করতেন, এবং সেটি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ভাষা হিসেবেই পরিচিত।”

তাঁর মতে, “ড. ইউনূসের অতিরিক্ত ভ্রমণপ্রবণতা তাঁর প্রশাসনিক কাজের গুরুত্বকে আড়াল করছে। যতবার উনি বিদেশে যাচ্ছেন, ততবারই জনগণ প্রশ্ন করছে, এসব সফরের বাস্তব ফলাফল কী? জাতিসংঘ বা এর অধীন সংস্থাগুলোর আমন্ত্রণে যোগদান অবশ্যই ইতিবাচক, তবে সেটি যেন দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।”

প্রধান উপদেষ্টা সম্প্রতি ইতালির রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামে যোগ দিতে গিয়েছিলেন, যেখানে তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গঠনে ছয় দফা প্রস্তাবনা দেন। ওই সফরে তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট, জিবুতির প্রধানমন্ত্রী, রোমের মেয়রসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। দেশে ফেরার পর তাঁর এ সফর নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

গোলাম মাওলা রনি বলেন, “আমরা সবাই জানি, ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একজন নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব। তাঁর উপস্থিতি যে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব বহন করে, তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর এখন দায়িত্ব দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া। এই মুহূর্তে বিদেশ সফরগুলো যদি জনগণের দৃষ্টিতে অগ্রাধিকারের তালিকায় না থাকে, তবে সেগুলো নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে।”

তিনি আরও বলেন, “দায়িত্বে আসার পর থেকেই প্রধান উপদেষ্টা বেশ কয়েকবার বিদেশ সফরে গেছেন—কখনও সম্মেলনে, কখনও বৈঠকে, কখনও পুরস্কার গ্রহণে। কিন্তু দেশে ফিরে তাঁর এসব সফরের অর্জন বা প্রভাব নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা জনগণ পায় না। আন্তর্জাতিক মহলে বক্তৃতা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার প্রতিফলন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে দেখা না গেলে, তা কেবল প্রদর্শনমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবেই গণ্য হয়।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশও একই মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, ড. ইউনূসের বিদেশ সফরগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে ঠিকই, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনে এখন স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার এই সময়ে সরকারের প্রধানের ঘনঘন অনুপস্থিতি জনগণের আস্থা কিছুটা নড়বড়ে করছে।

অন্যদিকে, ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, এই সফরগুলো আসলে বাংলাদেশের স্বার্থেই। তাঁর প্রতিটি সফরের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো, মানবিক সাহায্য আহ্বান করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। তারা মনে করেন, একজন নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর এই নেটওয়ার্ক ও বৈশ্বিক উপস্থিতি দেশের জন্যই ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, “দেশে যখন প্রশাসনিক সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে, তখন সরকারপ্রধানের বিদেশ সফর কতটা প্রাসঙ্গিক?” কেউ কেউ লিখেছেন, “দেশে আগুন জ্বলছে, নেতা বিদেশে বক্তৃতা দিচ্ছেন।” আবার অন্যরা বলছেন, “বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা জরুরি, তবে তার আগে ঘরের আগুন নেভানো দরকার।”

গোলাম মাওলা রনি তাঁর বিশ্লেষণে আরও বলেন, “ড. ইউনূস দেশের মানুষের আস্থা অর্জনের সবচেয়ে বড় সুযোগ পেয়েছিলেন—একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে। কিন্তু সেই সুযোগকে তিনি কতটা ব্যবহার করছেন, সেটি এখন বিতর্কের জায়গা। তাঁর কথাবার্তা, কর্মকাণ্ড এবং সফর—সব কিছুই এখন বিশ্লেষণের আওতায়।”

তিনি মন্তব্য করেন, “রাজনীতি মানে শুধু আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তৃতা নয়, দেশের মাঠে মানুষের আস্থা ফিরে পাওয়া। তিনি যদি সত্যিই পরিবর্তনের প্রতীক হতে চান, তবে তাঁকে দেশের ভেতরেই থেকে সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। জনগণ চায় একজন কর্মী, বক্তা নয়।”

অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, সরকারের প্রধান উপদেষ্টার এই সময়ে বিদেশ সফর থেকে প্রত্যাশিত ফল পেতে হলে তা হতে হবে স্পষ্ট উদ্দেশ্যনির্ভর ও স্বচ্ছ। শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থিত থাকা নয়, বরং দেশে ফিরে তার ফলাফল বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও জনসম্মুখে তুলে ধরা দরকার।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দেশের জনগণ এখন এমন এক পর্যায়ে আছে, যেখানে তারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়। বিদেশ সফর বা বক্তৃতা দিয়ে নয়, বরং দেশের মাটিতে কাজের মাধ্যমে সেই পরিবর্তন আনতে পারলেই জনগণ ড. ইউনূসের ওপর আস্থা রাখবে।

দেশের এক তরুণ উদ্যোক্তা সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আমরা চাই নেতৃত্ব, উপস্থিতি নয়। বিদেশে গিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার চেয়ে দেশে থেকে সমস্যা সমাধান করাটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।”

সবশেষে গোলাম মাওলা রনি বলেন, “ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে তিনি এখন বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধি—একজন আন্তর্জাতিক বক্তা নয়। তাই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন জনগণের স্বার্থে হয়, জনগণের কাছে ব্যাখ্যাযোগ্য হয়। কারণ জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।”

দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও জনজীবনের অস্থিরতার এই সময়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিটি সিদ্ধান্তই গুরুত্ব বহন করছে। তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, কী অর্জন করছেন—সবকিছুই এখন দেশের মানুষের নজরে। তাই তাঁর প্রতিটি সফর এখন কেবল কূটনৈতিক সফর নয়, বরং এক রাজনৈতিক বার্তাও বটে। আর সেই বার্তায় জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করাই হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত