৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচনে ভোটের উৎসব

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৭ বার

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

৩৫ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাকসু, হল সংসদ এবং সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি কেন্দ্রজুড়ে এক উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শুরু হয় এই ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণ। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ছাত্র রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ আজ নতুন করে মুখর হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের পদচারণা, হাসি আর আশায়।

ভোর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্রে ছুটে আসতে শুরু করেন। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রান্তে দেখা যায় এক অনন্য উচ্ছ্বাস—কারও হাতে পরিচয়পত্র, কেউবা প্রার্থীর প্রতীক আঁকা ব্যাজ পরে ভোটের অপেক্ষায়। এতদিন পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারার আনন্দে মুখর ছিলো পুরো ক্যাম্পাস। অনেকে জানিয়েছেন, এ যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক ইতিহাস রচনার দিন।

ভোট দিতে এসে মুন্নুজান হলের বিতর্ক বিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী সানজিদা বলেন, “আমি বিতর্কের মানুষ, তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি বিতর্ক বিষয়েই। আমার হলের আপুরা আমার কাজ ও যোগ্যতা জানেন, আমি বিশ্বাস করি তারা আমাকে সমর্থন দেবেন। আজকের দিনটা আমাদের জন্য ঐতিহাসিক।” একইভাবে উৎসাহ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরাও। অনেকেই বলেছেন, এটি কেবল একটি নির্বাচন নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্র ও শিক্ষার্থীদের অধিকার ফিরে পাওয়ার প্রতীক।

রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে আধিপত্যবিরোধী ঐক্য প্যানেলের প্রার্থী সালাউদ্দীন আম্মার বলেন, “ভোটের পরিবেশ এখন পর্যন্ত খুবই ভালো। সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিচ্ছেন। দিন শেষে আশা করছি একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক ফলাফল পাব।”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে রাকসুর মোট ভোটার সংখ্যা ২৮ হাজার ৯০১ জন। রাকসু, হল সংসদ ও সিনেট প্রতিনিধি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ৮৬০ জন প্রার্থী। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোটা ক্যাম্পাসে মোতায়েন করা হয়েছে দুই হাজার পুলিশ, ছয় প্লাটুন বিজিবি ও বারো প্লাটুন র‍্যাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে শুরু করে ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত নিরাপত্তার বলয় তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে না পারে।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণায় চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ক্যাম্পাসের পুরনো শিক্ষার্থীরা বলছেন, ১৯৯০-এর দশকে সর্বশেষ রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর থেকে নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী রাকসুর মতো একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনের অভাবে নিজেদের দাবি ও অধিকার আদায়ে সংগঠিত হতে পারেননি।

এবারের নির্বাচনে মোট ১১টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যার মধ্যে আলোচনায় রয়েছে ৮টি প্রধান প্যানেল। এর মধ্যে ছাত্রদল-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’, ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বে গঠিত ‘রাকসু ফর র‍্যাডিক্যাল চেঞ্জ’, সাবেক সমন্বয়কদের নেতৃত্বে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’, বাম জোটের ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’, ছাত্র ইউনিয়নের ঘোষিত ‘অপরাজেয় ৭১, অপ্রতিরোধ্য ২৪’, সাবেক নারী সমন্বয়কের নেতৃত্বে ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলন মনোনীত ‘সচেতন শিক্ষার্থী পরিষদ’। প্রতিটি প্যানেলই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের নিজস্ব ইশতেহার ও কর্মসূচি প্রচারে ক্যাম্পাসজুড়ে প্রাণবন্ত প্রচারণা চালিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণের প্রতিটি ধাপ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, “৩৫ বছর পর এই নির্বাচন আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্রচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করুক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।”

ক্যাম্পাসের প্রবীণ শিক্ষকরাও রাকসু নির্বাচনের প্রত্যাবর্তনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ রাজনীতির জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নাসির উদ্দিন জানান, “রাকসু নির্বাচন শুধু রাজনীতি নয়, এটি নেতৃত্ব তৈরি ও শিক্ষার্থীদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি প্রক্রিয়া। এত বছর পর শিক্ষার্থীরা আবারও সেই সুযোগ পাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে এক আশাব্যঞ্জক সূচনা।”

অন্যদিকে, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনেকে মনে করছেন, রাকসু নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও দাবি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে। আবাসিক হলের সুযোগ-সুবিধা, টিউশন ফি, একাডেমিক সংস্কার, শিক্ষার মানোন্নয়ন—সব বিষয়েই রাকসু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।

ভোটগ্রহণ চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এরপর শুরু হবে গণনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও হলে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর ক্যাম্পাসে উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন প্যানেলের কর্মী-সমর্থকেরা।

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর এমন এক গণতান্ত্রিক উৎসব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য এক নতুন প্রভাতের বার্তা বয়ে এনেছে। যে প্রজন্ম এতদিন রাকসু নামটি কেবল ইতিহাস বই ও সিনিয়রদের মুখে শুনেছে, তারাই আজ নিজেদের হাতে ভোট দিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছে। এ যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন যুগের সূচনা—যেখানে তরুণদের কণ্ঠস্বর আবারও শোনা যাবে রাকসু মঞ্চে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কেন্দ্রবিন্দুতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত