প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে বায়ুদূষণ। আন্তর্জাতিক গবেষণা গোষ্ঠী জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (ZCA)–এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সালে শুধু বায়ুদূষণের কারণেই দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী অন্তত ১৯ হাজার শিশু মারা গেছে। অর্থাৎ, প্রতি ঘণ্টায় দুইটি নিষ্পাপ প্রাণ নিঃশব্দে ঝরে যাচ্ছে দূষিত বাতাসের নির্মম গ্রাসে।
“স্ট্রাকচারাল ডিপেনডেন্সিস পারপেচুয়েট ডিসপ্রোপোরশনেট চাইল্ডহুড হেলথ বার্ডেন ফ্রম এয়ার পলিউশন” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বায়ুদূষণের প্রধান দুটি উৎস হলো গৃহস্থালি জ্বালানির ধোঁয়া ও বাইরের পরিবেশগত দূষণ। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে গৃহস্থালি দূষণ থেকে। প্রতিবেদনটি জানায়, রান্নার কাজে পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে সম্পূর্ণ রূপান্তর ঘটানো গেলে প্রতিবছর অন্তত ১৬ হাজার ২৬৪ শিশুর মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হতো।
বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমা ও অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুর ৪০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে বায়ুদূষণ দায়ী। ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোর তথ্য বিশ্লেষণেও এ চিত্রের মিল পাওয়া গেছে।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাজিদ হোসেন খান বলেন, “দেশে বায়ুদূষণজনিত রোগ বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস ও অ্যাজমার প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি পূর্বে কার্যকর ওষুধে যেসব রোগ সহজে সারত, এখন সেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হচ্ছে।”
ইটভাটার ধোঁয়া সবচেয়ে বড় হুমকি
ঢাকায় পরিচালিত ১০ বছরের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইটভাটা থেকে নির্গত অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা (PM 2.5) শিশুদের ফুসফুসের জন্য ভয়ংকর হুমকি তৈরি করছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার হাসপাতালভিত্তিক এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মোট PM 2.5-জনিত শ্বাসকষ্টে ভর্তি রোগীর ২৮ শতাংশই চার বছরের নিচের শিশু। অথচ এই বয়সী শিশুরা জনসংখ্যার তুলনায় অতি ক্ষুদ্র অংশ। প্রতি ঘনমিটারে PM 2.5 এর মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম বেড়ে গেলে এই শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও তীব্র ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্তের হার ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭ হাজার ৮৬টি ইটভাটা চালু রয়েছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ৫০৫টির পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। বেসরকারি পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, অধিকাংশ ইটভাটা নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যা বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ক্যাপস (CAPS)–এর ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণের ২৮ শতাংশের জন্য এককভাবে দায়ী ইটভাটাগুলো।
দূষিত বাতাসে শিশুদের শারীরিক বিকাশের বিপর্যয়
ZCA–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুরা শারীরিক গঠনের দিক থেকে বায়ুদূষণের প্রভাবের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। কারণ তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, এবং তারা অধিকাংশ সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়—যার ফলে ফুসফুসে দূষিত বায়ু সরাসরি প্রবেশ করে। শিশুকালে শ্বাস নেওয়া বায়ুর মান তাদের ফুসফুসের গঠন ও সক্ষমতা নির্ধারণ করে। দূষিত বাতাসে বড় হওয়া শিশুদের ফুসফুস সাধারণত ছোট হয়, এবং আজীবনের জন্য তাদের শ্বাসযন্ত্র দুর্বল থেকে যায়।
ডা. সাজিদ হোসেন খান আরও বলেন, “শিশুদের ফুসফুসের বিকাশ ধীরগতিতে হয়। তাই দূষিত বাতাসে তারা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্বল ফুসফুস তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়, ফলে তারা বারবার সংক্রমিত হয়।”
গর্ভকালীন ও শৈশবের সূচনাতেই ভয়াবহ প্রভাব
গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, গর্ভকালীন সময় ও শিশুকালের শুরুতে বায়ুদূষণের সংস্পর্শে এলে তা শিশুর সারাজীবনের জন্য বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। এটি মস্তিষ্কের বিকাশ, স্মরণশক্তি এবং আচরণগত সক্ষমতায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাইরের বায়ুদূষণ মাত্র ২০ শতাংশ কমানো গেলে শিশুদের স্মরণশক্তি ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
প্রতিরোধ নয়, এখনো অবহেলা
বাংলাদেশে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নীতিগত অগ্রগতি থাকলেও তা বাস্তবায়নে ঘাটতি সুস্পষ্ট। রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে এখনো কয়লা, কাঠ ও নিম্নমানের জ্বালানির ব্যবহার কমেনি। অপরদিকে গৃহস্থালি পর্যায়ে নিরাপদ চুলা বা পরিবেশবান্ধব রান্না প্রযুক্তির প্রসারও সীমিত।
পরিবেশবিদদের মতে, বায়ুদূষণকে শুধু পরিবেশগত নয়, বরং জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। শিশুদের সুরক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রসার, এবং নগর এলাকায় সবুজায়ন বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শারীরিকভাবে আরও দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়বে। বর্তমানে যে শিশুরা নিঃশব্দে দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, তারা একদিন দেশটির অর্থনীতি, সমাজ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বিশাল চাপ তৈরি করবে।
বাংলাদেশ এখনো সময় হাতে পেয়েছে—কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, নীতিনির্ধারকরা কি এই বিপর্যয়ের গুরুত্ব বুঝবেন, নাকি নিঃশব্দে হারিয়ে যাবে আরও অগণিত শিশু, এই ধোঁয়ায় ঢাকা শহরের অদৃশ্য মৃত্যুর মিছিলে?