প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের রেল যোগাযোগে বড় পরিবর্তন আসছে আগামী ২৪ অক্টোবর থেকে। ওই দিন থেকে একজনের নামে ক্রয়কৃত ট্রেনের টিকিটে আরেকজন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন না। যাত্রার সময় প্রত্যেক যাত্রীকেই বাধ্যতামূলকভাবে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সঙ্গে রাখতে হবে। রেল টিকিট ব্যবস্থায় এই নতুন নিয়ম কার্যকর করার সিদ্ধান্ত এসেছে সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও টিকিট কালোবাজারি রোধের অংশ হিসেবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। বৈঠকে সিলেটের রাজনীতিক, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রেলওয়ে ও বিমান কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক জানান, সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে রেল টিকিটের কালোবাজারি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-সিলেট সড়কের নাজুক অবস্থার কারণে ট্রেনভ্রমণের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, যার বড় অংশই কালোবাজারিদের হাতে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ যাত্রীরা টিকিট না পেয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক নিজেই সম্প্রতি সিলেট রেলস্টেশন পরিদর্শন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি যাত্রী ও স্থানীয়দের কাছ থেকে নানা অভিযোগ শোনেন। এরপর বৃহস্পতিবারের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
মো. সারওয়ার আলম বলেন, “২৪ অক্টোবর থেকে সিলেটে কেউ অন্যের নামে টিকিট ব্যবহার করতে পারবে না। ট্রেন ভ্রমণের সময় প্রত্যেক যাত্রীকে নিজের এনআইডি সঙ্গে রাখতে হবে। এটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “প্রথমদিকে কিছুটা ভোগান্তি হতে পারে, তবে এটি টিকিট কালোবাজারি বন্ধের কার্যকর উপায়। একজনের টিকিটে অন্যজন ভ্রমণ বন্ধ করতে পারলে দালাল চক্রের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যাবে।”
সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজাউন নবী, সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুর রহমানসহ প্রশাসনের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। এছাড়া রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, রেলওয়ে ও বিমান কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংস্কার কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি তোলেন অংশগ্রহণকারীরা। ঘন ঘন বিমানের ভাড়া বৃদ্ধি, রেল টিকিটের সংকট ও কালোবাজারি বন্ধ এবং আঞ্চলিক সড়কগুলোতে ভাঙন ও যানজট সমস্যা সমাধানের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়।
বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজাউন নবী সভায় বলেন, “সিলেটের সঙ্গে যেন বিমাতাসুলভ আচরণ না করা হয়, সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থায় সিলেট এখনো পিছিয়ে আছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় সিলেটকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।” তিনি আরও আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে কোনো সিন্ডিকেট বা দালাল চক্র যেন যাত্রীদের জিম্মি করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এছাড়া জেলা প্রশাসক জানান, নগরের হকারদের পুনর্বাসনের জন্য লালদিঘির মাঠ পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি বলেন, “১৮ অক্টোবর পর্যন্ত নগরের সড়ক ও ফুটপাতে হকাররা বসতে পারবে। এরপর থেকে কেউ ফুটপাতে দোকান বসালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ট্রেন টিকিটের কালোবাজারি ও সড়কপথের অব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে “জনগণের পক্ষে সাহসী উদ্যোগ” বলে অভিহিত করেছেন।
তবে কিছু যাত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এনআইডি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ও টিকিট কেনাবেচায় নতুন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে। তারা চান, রেলওয়ে যেন এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত প্রচার ও সচেতনতা কার্যক্রম চালায়।
সব মিলিয়ে, ২৪ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে সিলেট রেলপথে এক নতুন অধ্যায়। প্রশাসন আশা করছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে টিকিটের কালোবাজারি বন্ধ হবে, সাধারণ যাত্রীরা সহজে টিকিট পাবেন, এবং রেল ভ্রমণে শৃঙ্খলা ফিরবে। সিলেটবাসীর প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ কেবল কাগজে নয়—বাস্তবেও যেন কার্যকর হয়।










