একটি বাংলাদেশ অনলাইন | ১৯ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে ভারতের সঙ্গে পূর্ববর্তী সময়ে স্বাক্ষরিত দশটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বাতিল করা হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জাতীয় স্বার্থ, আর্থিক কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভারসাম্য বিবেচনা করে।
পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ত্রিশটিরও বেশি সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্প কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং বাংলাদেশের আর্থিক দায়িত্বের ভারসাম্য না থাকায় এগুলো পুনর্মূল্যায়নের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। বিস্তারিত যাচাই-বাছাই শেষে সরকার দশটি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বাতিল হওয়া চুক্তিগুলোর মধ্যে ছিল অবকাঠামো, রেল ও নৌ যোগাযোগ, শিল্পাঞ্চল স্থাপন, বন্দর সংযোগ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্কিত প্রকল্প। এসব চুক্তির বেশ কয়েকটি বাংলাদেশের পক্ষে প্রত্যাশিত সুফল আনতে ব্যর্থ হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজ এগোয়নি। আবার কিছু চুক্তির আর্থিক বোঝা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য টেকসই নয় বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট—যে সব চুক্তি দেশের জনগণের উপকারে আসে না, সেগুলোর পুনর্মূল্যায়ন অনিবার্য। তিনি বলেন, “আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ করছি, তবে প্রত্যেকটি সহযোগিতা চুক্তি বাস্তবসম্মত ও পারস্পরিক লাভজনক হতে হবে।”
তবে সরকার জানিয়েছে, সব চুক্তিই বাতিল করা হয়নি। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময়, তথ্যপ্রযুক্তি এবং জ্বালানি খাতের কিছু সমঝোতা স্মারক এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় একযোগে কাজ করছে, যাতে নতুন শর্ত ও বাস্তবতার ভিত্তিতে সহযোগিতার কাঠামো আরও দৃঢ় করা যায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পর্যালোচনার ফলে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে যৌথ উন্নয়নমূলক উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কর্মকর্তারা আরও জানান, সম্পর্কের গভীরতা বজায় রেখে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভারসাম্যই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।
অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বাস্তবমুখী পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রকেই সময়ের প্রেক্ষাপটে তার কৌশলগত চুক্তি ও অঙ্গীকারগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে হয়। এটা সম্পর্কের অবনতি নয়, বরং সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার প্রক্রিয়া।”
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে নতুন বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করার। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ভারতের রপ্তানি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় নয়গুণ বেশি। অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বাংলাদেশের পক্ষে এই ভারসাম্যহীনতা কমাতে স্বার্থনির্ভর নতুন চুক্তি অপরিহার্য।
সরকারের এক সিনিয়র সচিব বলেন, “আমরা কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছি না। বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখতে পুরনো চুক্তিগুলোকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুনর্বিন্যাস করছি।” তিনি আরও জানান, সরকার এখন আঞ্চলিক অংশীদারিত্বে নতুন ভারসাম্য খুঁজছে—যেখানে ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সমান গুরুত্বে কাজ করা হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগ কাঠামোতে পারস্পরিক সম্মান ও স্বচ্ছতার নীতি প্রতিষ্ঠা করলে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়াবে।
সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেনি, তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে পারস্পরিক স্বার্থে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র উন্মোচন করা হবে।
সব মিলিয়ে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে একাধিক চুক্তি একসঙ্গে পর্যালোচনার আওতায় এসেছে, যা দেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও স্বনির্ভর ও বাস্তবভিত্তিক পথে এগিয়ে নিচ্ছে।