বিএনপির নভেম্বরের শুরুতেই প্রার্থী তালিকা প্রকাশের প্রস্তুতি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৩ বার
বিএনপির নভেম্বরের শুরুতেই প্রার্থী তালিকা প্রকাশের প্রস্তুতি

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন টানটান উত্তেজনা। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, অর্থাৎ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র সাড়ে তিন মাস। এমন সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের প্রার্থী চূড়ান্তের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের শেষে কিংবা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই ৩০০ আসনের প্রার্থী ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

দলীয় বিভিন্ন সূত্র ও ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জানা গেছে, বিএনপি এবার প্রার্থী বাছাইয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে ত্যাগ, যোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তাকে। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে দলীয় পতাকা বহন করে যারা নানা নির্যাতন-নিপীড়ন, হামলা-মামলা, নির্বাসন, কিংবা কারাভোগের মধ্যেও দলের আদর্শে অবিচল থেকেছেন—তাঁরাই এবার মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। প্রতিটি আসনে পাঁচ থেকে দশজন করে মনোনয়নপ্রত্যাশীর তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে, যার মধ্যে থেকে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্বাচন করছেন তারেক রহমান নিজে।

সূত্র জানায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি কয়েকটি বিশেষ টিম গঠন করেছেন, যেখানে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা রয়েছে। এসব টিম প্রার্থীদের যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা যাচাই করে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠিয়েছে তাঁর কাছে। যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হলে তারেক রহমান নিজেই প্রার্থীদের ফোন করে মনোনয়ন নিশ্চিত করছেন এবং অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী মাঠে কাজ করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, একাধিক আসনে প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও দলটি এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তাঁদের মতে, প্রতিযোগিতা থেকেই বেরিয়ে আসবে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী। যাঁরা দলে থেকে আন্দোলনের কঠিন সময়েও মাঠে ছিলেন, তাঁদেরই এবার অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে পরিষ্কার বার্তাও দেয়া হচ্ছে—মনোনয়ন না পেলেও সবাইকে ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে, আর যারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন, ভবিষ্যতে সরকার গঠন হলে তাঁদেরকে ভিন্নভাবে রাষ্ট্রীয় ও সাংগঠনিক পর্যায়ে সম্পৃক্ত করা হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে এ বিষয়ে দুটি মতামত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, শরিক দলের জন্য যেসব আসন ছেড়ে দেয়া হবে, সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি আসনের প্রার্থী ঘোষণা করা উচিত। অন্যরা মনে করছেন, যেহেতু শরিকদের আসন বণ্টন এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তাই আপাতত ৩০০ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করা হোক। পরবর্তীতে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা যাবে।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, বিএনপি এমন একটি রাজনৈতিক দল যেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় থাকে। কোনো একক প্রার্থীকে আগে থেকে নির্ধারণ করা হয় না। তাঁর ভাষায়, “আমরা তৃণমূল থেকে শুরু করে জনগণের মতামত নিচ্ছি। এলাকার যিনি সবচেয়ে জনপ্রিয়, জনগণের আস্থাভাজন, তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। সময় লাগছে, কারণ আমরা সঠিক প্রার্থী খুঁজে বের করতে চাই। অনেক দলে একক প্রার্থী আগেই ঠিক করা থাকে, কিন্তু বিএনপি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী—এটাই আমাদের পার্থক্য।”

বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্প্রতি গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিভাগভিত্তিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলের শীর্ষ নেতারা। অনেক বৈঠকেই ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন তারেক রহমান। বৈঠকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তাঁদের রাজনৈতিক কার্যক্রম, জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক অবদান তুলে ধরেন। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেখানে দলের প্রধানের বার্তা পৌঁছে দেন—ধানের শীষের প্রার্থী যেই হোক, সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। কেউ বিভেদ সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, “একক প্রার্থী এখনো ঘোষণা করা হয়নি। মহাসচিব সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন যিনি পাবেন, তাঁর জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে।” বগুড়া জেলার বেশ কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সঙ্গেও ভার্চুয়ালি যোগাযোগ করেছেন তারেক রহমান। বগুড়া-৪ আসনের প্রার্থী মোশারফ হোসেন বলেন, “তিনি (তারেক রহমান) নিজে ফোন করে আমাকে জানান, মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত। একই সঙ্গে বলেছেন, সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, “ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রতিটি আসনের প্রার্থীদের বিষয়ে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তথ্য নিয়েছেন। যাচাই-বাছাই শেষ হলে তিনি নিজেই প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। যাঁরা মনোনয়ন পাচ্ছেন না, তাঁদেরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ সরকারে ও দলে তাঁদের ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকবে।”

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “বিএনপি একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। কোনো কোনো আসনে ১০-১২ জন যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন, কিন্তু মনোনয়ন দেয়া হবে একজনকেই। তাই দলীয় ঐক্যই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দল যদি বিজয়ী হয়, সবাই উপকৃত হবে; ব্যর্থ হলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “গত ১৭ বছর ধরে বিএনপি আন্দোলনে ছিল। সে সময়েই মূলত অনেক প্রার্থী চিহ্নিত হয়ে গেছেন। যারা দুঃসময়ে দলের পাশে ছিলেন, হামলা-মামলা সহ্য করেছেন, নেতাকর্মীদের রক্ষা করেছেন, তাঁরাই এবার অগ্রাধিকার পাবেন।”

বিএনপি নেতাদের ভাষায়, এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন হতে যাচ্ছে। তারেক রহমান নিজেও একাধিকবার বলেছেন, “স্বৈরাচার পতনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন নির্বাচনে জেতা সহজ হবে, কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। এখনই ঐক্য, সততা ও সাহসের সময়।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি এবার যদি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ঐক্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে আগামীর নির্বাচনে তারা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। তবে প্রার্থী ঘোষণার পর সেই ঐক্য কতটা বজায় থাকবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত