প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত আরেকটি অধ্যায় উন্মোচিত হলো বুধবার সকালে। টিএফআই-জেআইসি সেলে সংঘটিত গুম ও খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই মামলায় হেফাজতে থাকা ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই মামলাটি রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় অঙ্গনে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
বুধবার সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল চত্বরে ছিল চরম নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাজধানীর কাকরাইল, মৎস্য ভবন, হাইকোর্টের মাজারগেট ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সদস্যরা ভোর থেকেই অবস্থান নেন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে। আদালতের আশপাশে কঠোর নজরদারি চালানো হয়, যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। মামলার নথিপত্র ও প্রাথমিক অভিযোগ পর্যালোচনা শেষে আদালত ১৫ সেনা কর্মকর্তার জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালত জানায়, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁদের জামিন দেয়া যাবে না।
এই ১৫ কর্মকর্তাকে বুধবার সকালেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাঁরা সবাই জামিনের আবেদন করেন, কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আপত্তি জানান। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান প্রসিকিউটর বলেন, “এরা এমন অপরাধে জড়িত, যা কেবল ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্র ও মানবতার বিরুদ্ধে। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের হেফাজতে রাখা জরুরি।” অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, তাঁদের মক্কেলরা সরকারি দায়িত্ব পালনকালে আদেশ মেনে কাজ করেছেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁদের জড়িয়ে মামলা করা হয়েছে।
টিএফআই-জেআইসি সেলে সংঘটিত অপরাধ নিয়ে এই মামলাগুলো গত কয়েক বছর ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোপন সংস্থা ও গোয়েন্দা সেলগুলোর মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তি গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রমাণ ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়, যার একটিতে ১৭ জন এবং অন্যটিতে ১৩ জনকে আসামি করা হয়। দুই মামলায়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম রয়েছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মোট ৩০ জনের মধ্যে ২৩ জন সেনা কর্মকর্তা এবং বাকি আসামিরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ের ব্যক্তি। ২৩ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন বর্তমানে হেফাজতে রয়েছেন, বাকিরা পলাতক বা বিদেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। আদালত ইতিমধ্যে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, টিএফআই-জেআইসি সেলের তৎকালীন কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। সেখানে আটক ব্যক্তিদের অনেকেই আর জীবিত ফিরে আসেননি। মানবাধিকার সংস্থা ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রায় শতাধিক ব্যক্তি এই সেলের মাধ্যমে গুম বা খুন হন বলে দাবি করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই প্রমাণ পেয়েছে বলে জানায়।
বুধবার ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট ছিল। আদালতকক্ষে তাঁদের অনেকের পরিবার উপস্থিত ছিলেন, চোখে অশ্রু আর মুখে গভীর উদ্বেগের রেখা। এক কর্মকর্তার স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার স্বামী নির্দোষ। তিনি দেশের জন্য কাজ করেছেন। তাঁকে অন্যায়ের শিকার করা হচ্ছে।” অন্যদিকে, ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো ট্রাইব্যুনালের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, “বছরের পর বছর আমরা ন্যায়ের অপেক্ষায় ছিলাম। আজকের সিদ্ধান্তে অন্তত আশার আলো দেখছি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মামলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায় তৈরি করতে পারে। প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নাম এমন অভিযোগে আদালতে আসা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ন্যায়বিচারের পথে একটি বড় পদক্ষেপ, আবার কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রেক্ষাপটও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বিএনপি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই ঘটনাকে সরকারের অতীত কর্মকাণ্ডের জবাবদিহির অংশ হিসেবে দেখছে। বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা মন্তব্য করেন, “আমরা বহু বছর ধরে বলে আসছি, গুম-খুন কোনো রাজনৈতিক দলের নীতি হতে পারে না। আজ আদালত সেই কথারই প্রমাণ দিচ্ছে।” অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, “এটি একটি সাজানো নাটক। সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য ষড়যন্ত্র চলছে।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাইব্যুনালের এই আদেশ ভবিষ্যতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে। একজন সাবেক বিচারপতি বলেন, “এই মামলাটি শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি মানবতার প্রশ্ন। কারা দায়ী, তা আদালতের কাজ নির্ধারণ করা, কিন্তু সত্য উদঘাটন হোক—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।”
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই মামলার প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটি বিদেশি সংবাদমাধ্যম এ খবর প্রচার করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, “গুম-খুনের মতো অপরাধ মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ। বাংলাদেশ যদি সত্যিই এই মামলায় নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এটি হবে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।”
ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১২ নভেম্বর। ওই দিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, এর আগ পর্যন্ত সকল আসামিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হবে।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের আশপাশে মানুষের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। কেউ ন্যায়ের প্রত্যাশায়, কেউ কৌতূহলবশত, আবার কেউবা প্রিয়জনের খোঁজে আদালতের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সূর্য ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের মুখেও ভেসে উঠেছিল একটাই প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি অবশেষে গুম-খুনের দায় থেকে মুক্তির পথে এক নতুন ইতিহাস লিখতে যাচ্ছে?










