প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান আবারও ফিলিস্তিন ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, গাজায় বর্তমান যুদ্ধবিরতি রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং স্থায়ী শান্তির একমাত্র উপায় হলো ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান। মঙ্গলবার কুয়েত সফরে দেশটির আমির শেখ মেশাল আল আহমেদ আল জাবের আল সাবাহর সঙ্গে বৈঠকে এরদোয়ান এই বার্তা দেন।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তুরস্কের যোগাযোগ অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান গাজায় অর্জিত যুদ্ধবিরতির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, “এই যুদ্ধবিরতি রক্ষা করা এখন শুধু ফিলিস্তিন বা ইসরাইলের নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের দায়িত্ব। স্থায়ী শান্তির জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের বাস্তবায়নই সেই লক্ষ্য পূরণের একমাত্র পথ।”
তুর্কি প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, “ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। আমরা এমন একটি সময় পার করছি, যখন মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন কণ্ঠ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও আরব লীগসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে এখন দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।”
এরদোয়ান তার বক্তব্যে মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি কুয়েতের ভূমিকাকে প্রশংসা করে বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) বর্তমান সভাপতি হিসেবে কুয়েত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তুরস্কও সেই প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বৈঠকে সিরিয়ার রাজনৈতিক ঐক্য এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখার প্রশ্নেও তুরস্কের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, “তুরস্ক সবসময় এমন এক আঞ্চলিক নীতি অনুসরণ করবে, যা শান্তি, মানবতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে গঠিত।”
অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এরদোয়ান বলেন, “কুয়েত ও তুরস্কের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিনিয়োগ, জ্বালানি, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে আমাদের সহযোগিতা দুই দেশের জন্যই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি কুয়েতি বিনিয়োগকারীদের তুরস্কে আরও বেশি সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান এবং বলেন, “তুরস্কের উন্নয়নযাত্রায় কুয়েতের অংশগ্রহণ দুই দেশের বন্ধুত্বের বন্ধনকে আরও মজবুত করবে।”
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে তুরস্ক ও কুয়েতের মধ্যে চারটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এসব চুক্তি অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সংস্কৃতি বিনিময় এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন খাতে ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বকে সুদৃঢ় করবে বলে দুই দেশের পক্ষ থেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাজা যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে এরদোয়ানের এই আহ্বান মুসলিম বিশ্বের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল বাস্তবতায় তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে এরদোয়ান সেই অবস্থান আরও সুদৃঢ় করছেন।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, চলমান অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভক্ত অবস্থার মধ্যে তুরস্ক এখন মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে চায়। এরদোয়ানের এই সফর শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে মুসলিম ঐক্যের নতুন বার্তা বহন করছে।
কুয়েতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক এমন এক সময়ে এলো, যখন গাজায় মানবিক সংকট অব্যাহত এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের আহ্বান নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠায় নতুন রাজনৈতিক আলোচনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।