প্রকাশ: সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক │ একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমানের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণাত্মক পোস্ট ও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পাওয়া ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রতিবেদনসমূহের আলোকে এই সম্পাদকীয়টি প্রস্তুত করা হয়েছে। অনলাইন তথ্যচিত্র, কমিশন রিপোর্ট এবং বহু বছর ধরে নানা পর্যায়ে উত্থাপিত অভিযোগ-সম্বলিত নথির প্রেক্ষিতে গঠিত এই বিতর্ক শুধু ব্যক্তিগত অভিযুক্তি নয়; এটি জাতির নৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারাধিকারিক সক্ষমতার ওপর প্রশ্ন ওঠার মতো একটি ব্যাপক ইস্যু।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং কিছু তদন্তপ্রবণ সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অতীত বহু বছরের সময়ে গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এবং সেই অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে অনাস্থা। পোস্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে কিছু পলাতক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন—এমনকি এক ব্যক্তি, ব্যারিস্টার সারোয়ার (অবসরপ্রাপ্ত মেজর), এক-এক করে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বলেছেন যে তারা গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত নয়; তৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি কিছু পলাতক জেনারেলের নামও বলেছেন। একই অনুক্রমে লেখক মুস্তাফিজুর রহমান এবং অনেকে প্রশ্ন করেছেন, যদি অস্ত্রের চালান, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলো হয়েছে বলে হাজার হাজার পরিবারের কাঁদার ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, তাহলে যাদের অধীনে কাজ করা হয়েছিল তারা কি একা করে সবকিছু ঘটাতে পারে এবং যদি না পারে তাহলে তাদের সহায়তাকারীদের কাঠামো কোথায় কীভাবে কাজ করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক।
এই ধরনের প্রশ্ন ও অভিযোগ-উত্তর-আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রথমত স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন: গণতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেক অভিযোগ যাচাই-সূত্রসহ তদন্তের মাধ্যমে নির্ণীত হয়। কোনো ব্যক্তিকে অভিযোগ থেকে মুক্ত ঘোষণা বা দোষী সাব্যস্ত করার অধিকার কেবল আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার। তাই সামাজিক প্ল্যাটফর্মে উচ্চকণ্ঠে উত্থাপিত দাবি-অভিযোগগুলোকে সংবাদদল হিসেবে আমরা দায়িত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করছি—অর্থাৎ কোন অভিযোগই অন্বেষণ ও প্রমাণের বাইরে চূড়ান্ত বলা উচিত নয়। তবুও অনস্বীকার্য সত্য হলো বহু পরিবার আজও নিখোঁজ স্বজনের যন্ত্রণা, বিচারহীনতার কষ্ট ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পুনরাবৃত্তি অভিজ্ঞতায় জীবন যাপন করছেন। সেই দুঃখ-বেদনাকে মিডিয়া-জাতি হিসেবে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।
প্রাসঙ্গিকতা হলো—আইনি ও আন্তর্জাতিক বিচারের ইতিহাস দেখালো যে শুধুমাত্র “নিচুতল হিটম্যান”-দের দণ্ড করলেই বড় মাত্রার রাজনৈতিক-পারিপার্শ্বিক অপরাধের পরিণাম হয় না। সাবেক ইউগোস্লাভিয়ার, রুয়ারান্ডা বা অন্যান্য জায়গায় উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীলদের ওপরও দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছিল কারণ তারা তাদের অধীনস্থদের দ্বারা সংঘটিত গণঅপরাধ থামাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বা যথাযথ কর্তৃত্ব প্রয়োগে অনীহা প্রদর্শন করেছিলেন। তাই বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা অভিযোগগুলো—যদি প্রমাণিত হয়—তাহলে শুধু মাঠে কাজ করা অপরাধীদের শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; কোন কমান্ড-চেইন, কোন লজিস্টিক-নেটওয়ার্ক, কোন আর্থিক ও যোগাযোগ-সহায়ক ব্যবস্থা এই অপরাধগুলোকে সমর্থন করেছে সেটাও লক্ষ্য করা জরুরি।
প্রশ্নগুলো যে কঠোর, তা অনস্বীকার্য। কারা গাড়ি চালিয়েছে, কারা লাশ অপসারণ-সংরক্ষণ বা পরিবহন কাজে সরাসরি সহায়তা করেছে, অস্ত্রাগারের রেকর্ড কী, কোন মিডিয়া-ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে ঘটনাগুলো কভার করা হয়েছে—এসব জিজ্ঞাসা শুধুমাত্র প্রতিশোধমূলক অনুসন্ধান নয়; এগুলোকে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দাঁড় করানো হলে অনাগত বিচারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি হল বাহ্যিকদের মাধ্যমে আর্থিক চালান ও সম্মান প্রদান, যেগুলো যদি অপেক্ষাকৃত ছোট-খাটো ‘টাকা-বদল’ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে, তাহলেই তার বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
এখানে একটি নীতিগত কথা মনে রাখতে হবে—দীর্ঘমেয়াদী গণহত্যা-ধাঁচের কার্যক্রম এক বা দুই ব্যক্তির একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। এমন পরিসরে হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও গুমের একটি জটিল নেটওয়ার্ক এবং সার্টেন লেভেলের পরিকল্পনা ও সহযোগিতা ছাড়া চালিত হওয়া কল্পনা করা দায়। এই বাস্তবতা বিচারকার্যকে আরও গভীরভাবে প্রমাণ-ভিত্তিক তদন্তে প্ররোচিত করে। যেখানে র্যাব-র মতো forces-এর পোস্টিং কালানুক্রম, কোন অফিসারের টেনিউর, অস্বাভাবিক স্থায়ী নিয়োগ কিংবা কোনো ইউনিটের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্ট্যাবিলিটি অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল—এসব তথ্য তলানীতে গেলে অনেক সূত্র বেরিয়ে আসতে পারে। তাই যে সংগঠনিক গপনতা ও নিয়োগ-রীতি নিয়ে অপেক্ষমান সন্দেহ আছে সেগুলোও স্বাধীন তদন্তের আলোকে খতিয়ে দেখা প্রাসঙ্গিক।
একই সঙ্গে নাগরিক সমাজের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে। পরিবারগুলো, তাদের আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠন ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম—এসব প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো বিচারই সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে না। তদন্তপ্রক্রিয়া যদি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়, যদি সাক্ষ্য সংগ্রহে স্বাধীনতা থাকে এবং যদি অবমাননাকর প্রভাব কমিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের সুযোগ বিবেচনা করা হয়, তবে হতভাগা পরিবারগুলো অন্তত ন্যায়চেতনার রেশ অনুভব করতে পারবে।
অবশ্যই এই প্রক্রিয়ার একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—অতীতের অনেক ঘটনার তথ্যসাবিত্রা ক্ষীণ বা ঐক্যবদ্ধভাবে রেকর্ড করা হয়নি, অভিযুক্ত-সাক্ষীর হার ও সময়ের ব্যবধান অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট করেছে। তবু প্রযুক্তি-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ, মোবাইল-লগ, ব্যাংকিং-ট্রেডিং রেকর্ড, পোস্টিং-লগ এবং স্বাধীন ফরেনসিক তদন্ত এখনকার সময়ে বহু পুরনো মামলারও পুনরুদ্ধার সম্ভব করে। রাষ্ট্র যদি ইচ্ছা দেখায় এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তবে বহু অজানা কাহিনি আলোচনায় আনা সম্ভব।
পরিশেষে বলতেই হয়—ন্যায়প্রার্থনা ও নির্মম ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়া সাহসসাপেক্ষ। আমরা একটি জাতি হিসেবে যে পথে চলব, তা নির্ভর করবে আমাদের আইনি প্রক্রিয়ার সততা, তদন্তের পেশাদারিত্ব এবং সমাজের সহনশীলতানির্ভর স্থিতিশীলতার ওপর। যারা আজ বলতে চান যে নির্দোষ ব্যক্তিরা মুক্ত হোক, তাদের আকাঙ্ক্ষা জরুরি শুনতে হবে; তেমনি যারা বঞ্চিত পরিবারগুলোর অধিকারের কথা বলেন তাদের ব্যথাও রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করতে পারে না। এই দুটো দাবি একসঙ্গে পূরণের পথ খুঁজে বের করাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আমরা মূলত অনুরোধ করছি—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা এবং রাজনীতির সব স্তরকে মিলে একটি স্ববল পরীক্ষানির্ভর, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী তদন্ত প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। ন্যায় যতদিন না পোষণীয় প্রমাণভিত্তিক হয়ে জনগণের কাছে স্পষ্ট হবে, ততদিন বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের ছায়া কমবে না। ঐতিহাসিক ক্ষত সারাতে, পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে বিচারহীনতার পুনরাবৃত্তি রোধে এখনই সময় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার।
এই সম্পাদকীয়তে ব্যবহৃত তথ্যসমূহ মুস্তাফিজুর রহমানের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত মন্তব্য, বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং অনলাইনে পাওয়া প্রাসঙ্গিক দলিল ও বিশ্লেষণী লেখার সংকলন থেকে প্রণীত। সংবেদনশীল এই বিষয়টিতে পাঠককে অনুরোধ থাকবে—চূড়ান্ত রায় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আইনি তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক রিপোর্টকে সম্মান করুন।