প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে অনলাইন ভোটিং অ্যাপ—যার মাধ্যমে তারা বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করতে এবং ভোট প্রদান করতে পারবেন। এই উদ্যোগকে নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক মোড় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার (২২ অক্টোবর) সকালে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) জন্য আয়োজিত নির্বাচন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আগামী ১৬ নভেম্বর থেকে প্রবাসীদের জন্য ভোট নিবন্ধন অ্যাপটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রবাসী ভোটাররা রেজিস্ট্রেশন ছাড়াও ব্যালট ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, “আগে পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতিটি ছিল অকার্যকর ও জটিল। আমরা এবার সেটিকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও ডিজিটাল রূপে রূপান্তর করেছি। এখন থেকে আবেদন, যাচাইকরণ ও ব্যালট পাঠানো—সব কিছু অনলাইনে সম্পন্ন হবে। প্রবাসীরা তাদের মোবাইল বা কম্পিউটার থেকেই অংশ নিতে পারবেন।”
তিনি আরও জানান, প্রবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট এই অ্যাপে থাকবে একটি বিশেষ ব্যালট অপশন, যেখানে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বেছে নেওয়ার সুবিধা থাকবে। এই ব্যালট দেশের সাধারণ ব্যালট পেপারের চেয়ে ভিন্নধর্মী হবে। প্রবাসীদের ব্যালটে প্রার্থীদের প্রতীকসহ ভোট প্রদানের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ডিজিটালভাবে সম্পন্ন হবে, যা তথ্য নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মানদণ্ডে আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অ্যাপটির ট্রায়াল রান (পরীক্ষামূলক প্রয়োগ) চলছে। কয়েকটি দেশভিত্তিক প্রবাসী সংগঠন ও নির্বাচনি পর্যবেক্ষকদের সহায়তায় এই পরীক্ষা সম্পন্ন করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলক সফলতা অর্জনের পর আগামী ১৬ নভেম্বর থেকে তা বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “আমরা চাই প্রবাসীরা যেন তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে পিছিয়ে না থাকে। পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রবাসীদের ভোটাধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশ এবার সেই পথে হাঁটছে। আমরা শুধু একটি নির্বাচনের জন্যই এই প্রক্রিয়া চালু করছি, তবে ভবিষ্যতে এটি স্থায়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “পৃথিবীর যে কোনো দেশ থেকে একজন বাংলাদেশি নাগরিক, যার বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) রয়েছে, তিনি এই অ্যাপের মাধ্যমে ভোটের জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন। রেজিস্ট্রেশনের পর যাচাই শেষে তিনি অনলাইনে নিজের ব্যালট অ্যাক্সেস পাবেন।”
নির্বাচন কমিশনের আইসিটি বিভাগ জানিয়েছে, অ্যাপটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। ডেটা এনক্রিপশন, ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) এবং বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রতিটি ভোটার যাচাই করা হবে। ফলে কোনো ধরনের জালিয়াতি বা ডুপ্লিকেট ভোটের আশঙ্কা থাকবে না।
এই উদ্যোগকে “ডিজিটাল বাংলাদেশ”-এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে অভিহিত করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, প্রবাসীদের ভোটে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করছেন, যাদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘদিন ধরেই ভোটাধিকারে অংশ নেওয়ার সুযোগ চেয়ে আসছিলেন।
প্রবাসী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সপ্যাট্রিয়েটসের সভাপতি সেলিম আহমদ বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। আমরা বছরের পর বছর ধরে এই দাবিটি জানিয়ে আসছিলাম। অবশেষে নির্বাচন কমিশন তা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে, যা আমাদের দেশের প্রতি সংযুক্তি ও দায়বদ্ধতাকে আরও গভীর করবে।”
তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ সতর্ক করে বলেছেন, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই ব্যবস্থায় ভোট কারচুপির ঝুঁকি থাকতে পারে। এজন্য তারা কমিশনকে ধাপে ধাপে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এটি চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।
সবশেষে নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে নতুন আস্থার যুগে প্রবেশ করবেন। এটি শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং গণতন্ত্রের আরও গভীরতর বিকাশের একটি মাইলফলক।”
প্রবাসীদের ভোটে অংশগ্রহণের এই ডিজিটাল যাত্রা বাস্তবায়িত হলে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সাক্ষী হতে যাচ্ছে—যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চিত্রকে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে।










