প্রকাশ: সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি—যা ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে পরিচিত—অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত অধ্যায়। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার মঈনউদ্দিন ফখরুদ্দিন প্রশাসনের উত্থান ও কর্মকাণ্ড নিয়ে আবারও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংবাদসূত্র, অনলাইন তথ্যভান্ডার এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ২০০৭-২০০৮ সালের এই সময়কালকে অনেক গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারার একটি অন্তর্বর্তীকালীন মোড়” হিসেবে দেখলেও, আরেক পক্ষ একে “একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক শাসনপর্ব” বলে আখ্যা দিয়েছে।
এরশাদের পতনের সময় তিন জোট ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমঝোতায় ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। পরে মওদুদ পদত্যাগ করলে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন, যিনি শর্ত দেন—নির্বাচনের পর তাকে পুনরায় প্রধান বিচারপতির পদে ফিরিয়ে নিতে হবে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সংবিধানের একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করে এবং দেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়।
এরপর ১৯৯৬ সালে বিএনপির একতরফা নির্বাচন, তীব্র আন্দোলন এবং কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার সংযোজনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।
২০০৬ সালের শেষভাগে বিএনপির মেয়াদ শেষ হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ ও এর মিত্রদের অভিযোগ ছিল, বিএনপি বিচারপতি কে. এম. হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার লক্ষ্যে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে দেয়। পরিণতিতে বিচারপতি হাসান পদ না নেওয়ার ঘোষণা দিলে, প্রেসিডেন্ট ইয়াজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে নতুন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।
কিন্তু ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচনের ঠিক আগে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের জেরে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থনে ক্ষমতায় আসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন রূপ—ফখরুদ্দিন আহমদ প্রশাসন। সেই সঙ্গে দেশে জারি হয় জরুরি অবস্থা, যা ২০০৮ সালের শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ও বিশ্লেষকদের বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে, তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মঈন ইউ আহমদ রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং অঘোষিতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন। ঐ সময় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়েই গ্রেপ্তার হন; সংসদ ভবনের অস্থায়ী কারাগারে তাদের রাখা হয় এবং ব্যাপক দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে শতাধিক রাজনীতিককে আটক করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ফখরুদ্দিন-মঈন সরকারের কার্যক্রমে নিরপেক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশলই বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। ঐতিহাসিক নথি ও সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, সরকারটি শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজন করে নির্বিঘ্নে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ খোঁজে। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার আত্মজীবনী The Coalition Years বইয়ের ১১৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন, সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমদ তার ভারত সফরে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন যে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলেও তার সেনাপ্রধানের মেয়াদ পূর্ণ হবে, এবং প্রণব মুখার্জি তা নিশ্চিত করেন।
ফখরুদ্দিন সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে অনেকেই উল্লেখ করেন জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংবলিত ভোটার তালিকা প্রণয়ন, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স প্রবর্তন এবং আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনকে। তবে সমালোচকরা দাবি করেন, শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন বিএনপি ভাঙার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল এবং দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ সংস্কারপন্থীদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল।
তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের প্রভাবশালী সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে ১৩১টি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়, যা বিশ্লেষকদের মতে আওয়ামী লীগের পক্ষে কিছুটা সুবিধাজনক হয়।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে। সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমদকে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেনা সমর্থিত সরকারের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, জেনারেল আবদুল মতিন, জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. বারীর বিরুদ্ধে পরবর্তীকালে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পেয়েছেন, এমনকি সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগও পেয়েছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও নাগরিক সমাজের বিশ্লেষণে বারবার উঠে আসছে প্রশ্ন—তাহলে কি মঈন-ফখরুদ্দিন সরকারের তথাকথিত “নিরপেক্ষতা” আদৌ ছিল? নাকি সেটি ছিল কৌশলগতভাবে এক পক্ষকে নিরাপদে ক্ষমতায় ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পিত রূপ?
যদিও ফখরুদ্দিন সরকারকে অনেকেই “সংকটকালীন সমাধান” হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন, তবু ইতিহাসের বিচারে এই সরকার একটি বিশেষ রাজনৈতিক দিককেই বেশি সুবিধা দিয়েছে—এমন মত এখনো প্রবলভাবে উচ্চারিত হচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, ওয়ান ইলেভেন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের যাত্রাপথে এমন একটি অধ্যায়, যা এখনো ইতিহাস, ন্যায়বিচার ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নে জনমনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।