সেনা কর্মকর্তাদের আদালতে হাজির, ন্যায়বিচারের পথে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
সেনা কর্মকর্তাদের আদালতে হাজির—ন্যায়বিচারের পথে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সূচনা হলো, যখন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালতে হাজির করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেল। দীর্ঘদিন ধরে গুম, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে জর্জরিত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে মানবাধিকার অঙ্গনে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে, এবং এটিকে ন্যায়বিচার ও দায়বদ্ধতার পথে একটি “গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি” বলে উল্লেখ করেছে।

লন্ডনভিত্তিক সংস্থাটি বুধবার (২২ অক্টোবর) রাতে তাদের দক্ষিণ এশিয়া শাখার ফেসবুক পেজে এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গুমে জড়িত থাকার অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা গঠন ও আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হলো। বিবৃতিতে বলা হয়, “এই পদক্ষেপটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য আশার আলো জ্বালাবে, যারা বহু বছর ধরে ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করে আসছেন।”

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরও বলেছে, বিচার অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে। সংস্থাটি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন এই বিচার প্রক্রিয়া বেসামরিক আদালতে হয়, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো অমানবিক শাস্তি থেকে বিরত থাকা হয়। সংস্থার ভাষায়, “ন্যায়বিচার তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা মানবিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।”

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে গুম, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও বিতর্ক চলছিল। এই অভিযোগগুলো নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার তদন্ত দাবি করলেও তা অধিকাংশ সময় উপেক্ষিত ছিল। অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার আন্দোলনের জোরে আদালত তিনটি মামলায় ২৫ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়।

গত ৮ অক্টোবর মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি মামলা এবং জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের একটি মামলায় ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। সেদিনই প্রসিকিউশন আদালতে ফরমাল চার্জ দাখিল করে, যা বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

এরপর ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানায়, অভিযুক্ত ১৫ জন কর্মকর্তাকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন কর্মকর্তা অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) ছিলেন। পরদিন, অর্থাৎ ১২ অক্টোবর, ঢাকা সেনানিবাসের একটি ভবনকে সাময়িক কারাগার হিসেবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন পদক্ষেপ আগে কখনো দেখা যায়নি। তারা মনে করেন, এই পদক্ষেপ সেনাবাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে ভাঙার সূচনা করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফুল হক এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “এটি শুধু বিচার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার এক নতুন অধ্যায়। যদি এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়, তবে এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।”

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর ভেতরেও এই ঘটনাকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, আবার অনেকে এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও মন্তব্য করছেন। তবে সরকার ও বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, কাউকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করা হয়নি; বরং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রমাণ ও সাক্ষ্য অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, “যদি এই প্রক্রিয়া ন্যায্য ও স্বচ্ছ হয়, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার এক মডেল হতে পারে।”

দীর্ঘদিন ধরে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা এই সিদ্ধান্তকে স্বস্তির নিঃশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। রাজধানীর এক মানবাধিকার সমাবেশে গুম হওয়া এক ভুক্তভোগীর স্ত্রী বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে শুধু একটা জবাব চাইছিলাম—আমাদের প্রিয়জনরা কোথায়? আজ হয়তো সেই জবাবের পথে আমরা এক ধাপ এগোলাম।” তার চোখে ছিল স্বস্তি ও আশার মিশ্র ছায়া।

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক কঠিন পরীক্ষা। সামরিক প্রভাব ও রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে এই বিচার কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা গেলে তা দেশের আইনের শাসনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রক্রিয়া সফল হলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কেউই দায়মুক্তির আশ্রয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করার সাহস পাবে না।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতিতে শেষ পর্যন্ত বলা হয়, “বিচার শুধু অভিযুক্তদের শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং সমাজে ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তি পুনর্গঠনের জন্য।” বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ সেই পুনর্গঠনেরই সূচনা বলেই অনেকেই মনে করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত