জেনেভা ক্যাম্পে ককটেল বিস্ফোরণে যুবকের মৃত্যুতে উত্তেজনা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
জেনেভা ক্যাম্পে ককটেল বিস্ফোরণে যুবকের মৃত্যুতে উত্তেজনা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প—ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এই পুরনো এলাকা আবারও রক্তাক্ত হলো গভীর রাতে। বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে ক্যাম্পের ভেতরে দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় ভয়াবহ এক ককটেল বিস্ফোরণে প্রাণ হারালেন জাহিদ নামের ২০ বছর বয়সী এক তরুণ। গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা এই তরুণের মৃত্যুতে শোক আর ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্প।

নিহত জাহিদের বন্ধুরা জানিয়েছেন, তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, পরিশ্রমী এবং স্বপ্নবাজ এক যুবক। প্রতিদিনের মতো সেদিনও রাতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অজান্তেই জড়িয়ে পড়লেন হঠাৎ শুরু হওয়া এক সহিংসতায়, যার অবসান হলো তাঁর নিথর দেহে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত জাহিদের বন্ধু আফতাব হোসেন জানালেন, “রাতে আমরা কয়েকজন মিলে ক্যাম্পে হাঁটছিলাম। হঠাৎ দুই পক্ষের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হয়। কিছুক্ষণ পরই ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে সব কিছু ওলটপালট হয়ে যায়। একটা ককটেল জাহিদের ঠিক পাশে বিস্ফোরিত হয়, আর সঙ্গে সঙ্গে ও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।” তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, “আমরা ওকে ধরে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই, কিন্তু কিছুই করার ছিল না। চিকিৎসক বলেন, সে আর নেই।”

গুরুতর আহত অবস্থায় জাহিদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক সাংবাদিকদের বলেন, “চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ককটেলের বিস্ফোরণে জাহিদের শরীরের নিচের অংশে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।” তিনি আরও জানান, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি মোহাম্মদপুর থানাকে অবহিত করা হয়েছে।

ক্যাম্পের অভ্যন্তরে রাতভর চলে আতঙ্ক। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে জেনেভা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার ও ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। ঘটনার দিন রাতেও তুচ্ছ এক বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা দ্রুতই সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সংঘর্ষের সময় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যার একটি জাহিদের কাছাকাছি গিয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা হাসিনা বেগম বলেন, “রাতে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ এমন শব্দ হলো যে মনে হচ্ছিল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ধোঁয়া আর চিৎকারে চারদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। পরে শুনলাম এক ছেলেকে মেরে ফেলেছে বিস্ফোরণে।”

এই ঘটনার পর পুরো এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সকাল থেকেই ক্যাম্পের প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের একটি দল ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং বিস্ফোরণে ব্যবহৃত ককটেলের আলামত সংগ্রহ করেছে।

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি ক্যাম্পের দুই দলের মধ্যে পুরনো দ্বন্দ্বেরই পরিণতি। তিনি বলেন, “আমরা প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ করছি। ক্যাম্পের কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কারা এই সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটিয়েছে, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে।”

জাহিদের পরিবার এই ঘটনার ন্যায়বিচার দাবি করেছে। তাঁর বড় ভাই কামরুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার ভাই কোনো দলের সঙ্গে ছিল না। ও শুধু নিজের কাজ করত, পরিবারকে সাহায্য করত। এমন নিরীহ একজন ছেলেকে রাজনীতির নামে মেরে ফেলা হলো। আমরা বিচার চাই, যেভাবেই হোক।”

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে তখনও জাহিদের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল পরিবেশ। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না, তাদের হাসিখুশি জাহিদ আর ফিরবে না। জাহিদের এক সহকর্মী বলেন, “ওর জীবনের লক্ষ্য ছিল নিজের একটি ছোট ডিজাইন স্টুডিও তৈরি করা। ও সব সময় বলত, ‘আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।’ আজ সেই স্বপ্ন আগুনে পুড়ে গেল।”

মানবাধিকার সংগঠন ও স্থানীয় সমাজকর্মীরা বলছেন, এই ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হলে জেনেভা ক্যাম্পের সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর আরও নজরদারি প্রয়োজন। মোহাম্মদপুর অঞ্চলে একাধিক সময় ককটেল হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর বেশিরভাগেরই বিচার হয়নি। এতে অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ হারাচ্ছে নিরাপত্তার অনুভূতি।

রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় বহু বছর ধরে অপরাধচক্র ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশের তৎপরতা থাকলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি কখনো।

রাতের সেই বিস্ফোরণ শুধু একটি তরুণ প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং প্রশ্ন তুলে দিয়েছে রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে। মানুষের জীবনের মূল্য কতটা তুচ্ছ হয়ে পড়েছে, তা যেন এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হলো।

জেনেভা ক্যাম্প এখন শোক ও আতঙ্কে আচ্ছন্ন। তবে জাহিদের মৃত্যু হয়তো এই সম্প্রদায়ের জন্য নতুন এক প্রশ্নের সূচনা করবে—আর কত প্রাণ যাবে এই সহিংসতার আগুনে, আর কবে মানুষ ফিরে পাবে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবন?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত