প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এবার দীপাবলি উৎসবকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব বিতর্ক। ক্যালিফোর্নিয়াসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই আলোর উৎসবে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হলেও, দেশজুড়ে সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ঘৃণাপূর্ণ মন্তব্যের ঝড়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে ওভাল অফিসে দীপাবলির আয়োজন করলেও, তারই সমর্থকদের একাংশ এই উৎসবকে ‘অ-আমেরিকান’ ও ‘দানবীয়’ বলে আক্রমণ চালিয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে।
দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি মার্কিন সমাজের একটি অংশের অসহিষ্ণু মনোভাব নিয়ে আলোচনা চললেও, এবারের দীপাবলি বিতর্ক যেন সেটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থক ‘মাগা’ (Make America Great Again) ক্যাম্পেইনের অনেক সদস্য সামাজিকমাধ্যম এক্স ও ফেসবুকে দীপাবলি উদযাপনকারীদের লক্ষ্য করে লিখেছেন, “এটা যুক্তরাষ্ট্রের উৎসব নয়”, “দানব পূজার অনুষ্ঠান” বা “ভারতে ফিরে যাও”।
এই আক্রমণের মূল টার্গেট হয়েছেন দীপাবলির শুভেচ্ছা জানানো ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তারা। এর মধ্যে অন্যতম—এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল এবং জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য তুলসি গ্যাবার্ড। তারা দুজনেই দীপাবলির শুভেচ্ছা জানিয়ে এক্স-এ (পূর্বতন টুইটার) পোস্ট দেন।
তুলসি গ্যাবার্ড লেখেন, “ঈশ্বরের ভালোবাসার আলো আমাদের পথ দেখাক, সন্দেহের ছায়া দূর করুক, এবং আমাদের সকল কাজে তাঁর করুণা প্রতিফলিত হোক।” কিন্তু এই শান্তির বার্তার নিচেই মুহূর্তের মধ্যে ভরে ওঠে ঘৃণাপূর্ণ মন্তব্যে। কেউ লিখেছেন, “তোমার দানব ঈশ্বরকে নিয়ে ভারতে ফিরে যাও।” কেউ বা পোস্টে দিয়েছে অবমাননাকর মিম ও মন্তব্য। অনেকে আরও একধাপ এগিয়ে লেখেন, “দীপাবলি অ-আমেরিকান উৎসব”, “আমরা মূর্তিপূজা চাই না,
কাশ প্যাটেলও একই রকম অনলাইন হামলার শিকার হন। তার পোস্টে লেখা হয়, “তুমি নির্বাসিত হওয়া উচিত”, “যুক্তরাষ্ট্রে এমন মূর্তিপূজার কোনো স্থান নেই।” এসব মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় সহনশীলতার বাস্তবতা নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বিতর্ক এখানেই থেমে থাকেনি। সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নিকি হ্যালি—যিনি ভারতীয় শিখ ধর্মাবলম্বী পরিবারে জন্মগ্রহণ করে পরে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন—তিনিও দীপাবলির শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিকমাধ্যমে আক্রমণের মুখে পড়েন। কেউ লেখেন, “তুমি ভারতীয় না আমেরিকান?” আবার কেউ বলেন, “তুমি তোমার দানবদের নিয়ে ভারতে ফিরে যাও।”
অন্যদিকে, যখন এইসব বিদ্বেষমূলক মন্তব্যে সামাজিকমাধ্যম উত্তাল, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দেখা যায় ওভাল অফিসে দীপাবলির প্রদীপ জ্বালাতে কাশ প্যাটেল ও অন্যান্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নির্বাহীদের সঙ্গে। কিন্তু তার এই সৌজন্য আচরণ সমর্থক মহলের ঘৃণা প্রশমিত করতে পারেনি।
ব্রিটিশ-আমেরিকান সাংবাদিক মেহেদি হাসান এই ঘটনাগুলো নিয়ে মন্তব্য করেছেন, “এ যেন এক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বাস্তবতা—যে শক্তি ট্রাম্পপন্থিরা নিজেরাই তৈরি করেছিলেন, এখন সেই ঘৃণার আগুনে তারা নিজেরাই পুড়ছেন।” তিনি এক্স-এ বেশ কয়েকটি বিদ্বেষমূলক পোস্ট শেয়ার করে বলেন, “মাগা আন্দোলন আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ধর্মীয় সহনশীলতাও তাদের কাছে অপরাধ।”
ঘৃণার আগুনে ঘি ঢেলেছেন কিছু প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ও আইনজীবীও। যুক্তরাষ্ট্রের কনস্টিটিউশনাল অ্যাটর্নি ব্র্যাডলি পিয়ার্স একাধিক পোস্টে লেখেন, “আমেরিকাকে মহান করার মানে হলো মূর্তিপূজার জন্য অনুতপ্ত হওয়া, তা উদযাপন করা নয়।” তিনি আরও বলেন, “দীপাবলি হচ্ছে এক পৈশাচিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কোনো খ্রিষ্টানকে এটি উদযাপন করা উচিত নয়।”
একই সুরে কথা বলেছেন ‘ক্রিশ্চিয়ান ন্যাশনালিস্ট’ যাজক জো ওয়েবন। তিনি লিখেছেন, “কাগুজে আমেরিকানরা প্রকৃত আমেরিকান নন। আমি তাদের ছুটি বা তাদের মূর্তিপূজার ঈশ্বরকে শ্রদ্ধা করি না।” তিনি কাশ প্যাটেলকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে লেখেন, “বাড়ি ফিরে যাও এবং বালির দানবের পূজা কর।”
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্য দীপাবলিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, সরকারি ছুটি ঘোষণা করছে, স্কুল-কলেজে উদযাপনের আয়োজন করছে, অন্যদিকে একই দেশেই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার আগুন যেন নতুন করে জ্বলে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য নয়, বরং পুরো যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় সহাবস্থানের মানসিকতার জন্যই এক বড় পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, “মাগা” আন্দোলনের ভিতরে এখন এমন এক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা আমেরিকান পরিচয়কে একরকম ধর্মীয় একচ্ছত্রতার সঙ্গে মেলাচ্ছে। তাদের চোখে “আমেরিকান হওয়া” মানে খ্রিষ্টান হওয়া, আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি যেন তাদের জাতীয় পরিচয়ের জন্য হুমকি।
দীপাবলিকে ঘিরে এই বিতর্ক তাই কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের প্রশ্ন নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও বহুত্ববাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল অংশ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই ঘৃণার ভাষা যদি দমন না করা হয়, তবে এটি ভবিষ্যতে আরও গভীর সামাজিক বিভাজনের জন্ম দিতে পারে। তারা সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, ধর্মীয় সহনশীলতার নীতিকে রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিতে এবং অনলাইন বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।