সিলেটে অসামাজিক কার্যকলাপে চার হোটেল সিলগালা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৪ বার
সিলেটে অসামাজিক কার্যকলাপে চার হোটেল সিলগালা

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক / একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সিলেট নগরীতে অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সম্প্রতি পরিচালিত অভিযানে একের পর এক হোটেল সিলগালা করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহের অভিযানে নগরীর চারটি হোটেল বন্ধ করে দিয়েছে সিলেট মহানগর পুলিশ। পাশাপাশি অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত অভিযোগে আটক করা হয়েছে ১২ জনকে। এই ধারাবাহিক অভিযান নগরজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, অনেকের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি করেছে—যেখানে সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি প্রশাসনের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে শুক্রবার রাতে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ‘সিলেট রেস্ট হাউজ’, ‘বিলাস আবাসিক হোটেল’, ‘গ্র্যান্ড সাওদা হোটেল’ এবং ‘আল সাদী হোটেল’ সিলগালা করা হয়েছে। এসব হোটেলে দীর্ঘদিন ধরেই অসামাজিক কার্যকলাপ চলছে—এমন অভিযোগ পুলিশের কাছে একাধিকবার পৌঁছেছিল। নিয়মিত নজরদারির পর অবশেষে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি অভিযানে নামে।

অভিযান চলাকালে হোটেলগুলো থেকে বেশ কিছু আপত্তিকর উপকরণও উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে পুলিশের দাবি, এসব হোটেলকে কেবল আইন লঙ্ঘনের দায়েই নয়, বরং নগরীতে অপরাধের এক গোপন আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগেও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পর অনেক নতুন তথ্যও বেরিয়ে আসছে, যা নগরীর অন্য অংশে চলমান অবৈধ কার্যক্রমের চিত্র উন্মোচন করছে।

গত সপ্তাহজুড়ে শুধুমাত্র অসামাজিক কার্যকলাপ দমন নয়, মাদক ও চোরাচালান বিরোধী অভিযানেও জোর দিয়েছে মহানগর পুলিশ। ওই সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ২৫০ পিস ইয়াবা, ৫৮৭ বোতল বিদেশী মদ, ২০০ গ্রাম গাঁজা এবং ১০২ লিটার চোলাই মদ। এই বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সন্তোষ প্রকাশ করলেও, নগরবাসীর একাংশ মনে করছেন—এটি কেবলমাত্র iceberg-এর চূড়া, মূল চক্র এখনও পুরোপুরি ধরা পড়েনি।

চোরাচালান বিরোধী অভিযানে পাওয়া গেছে ভারতীয় পণ্যের বিশাল চালান। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ২,০৭১ পিস ভারতীয় শাড়ি, ৩১ প্যাকেট চকলেট, ১,৬০০ পিস স্কিন কেয়ার ক্রিম, ১ লাখ ৬৮ হাজারটি ভারতীয় বিড়ি এবং ৭৭০ প্যাকেট বিদেশী সিগারেট। এসব পণ্য নগরীর বিভিন্ন বাজারে অবৈধভাবে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে।

একই সপ্তাহে নগরীর বিভিন্ন থানায় মাদক ব্যবসায়ী ১৬ জন, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী ১০ জন, চিহ্নিত চোর ২৪ জনসহ মোট দুই শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পুরনো অপরাধী, যারা জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই কাজে জড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে।

পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে কিছু হোটেল ও অতিথিশালা অপরাধীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছিল। এসব স্থানে অবৈধ লেনদেন, মাদক বেচাকেনা ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পরেই ধীরে ধীরে এসব তথ্য সামনে আসছে। সিলগালা হওয়া চারটি হোটেলই এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে, মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতিও চলছে।

এই অভিযানের পর সিলেট নগরজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে সাধারণ মানুষ পুলিশের উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, হোটেল শিল্পে যেন এই অভিযানের প্রভাব নেতিবাচকভাবে না পড়ে। তারা মনে করেন, কয়েকজন অসাধু মালিকের কারণে পুরো শিল্পের সুনাম ক্ষুণ্ণ হওয়া উচিত নয়।

তবে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অপরাধীদের লক্ষ্য করছি। কেউ যদি হোটেলের আড়ালে অপরাধের আশ্রয় দেন, তিনি আইনের চোখে অপরাধীই থাকবেন।” তিনি আরও জানান, এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং কোনো অবস্থাতেই অসামাজিক বা অবৈধ কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।

অন্যদিকে, সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়—অসামাজিক কার্যকলাপ রোধে প্রয়োজন সচেতনতা, শিক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজ নেতৃত্ব একত্রে না আসলে এই প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন।

সিলেট নগরীর জনজীবন এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি—একদিকে কঠোর আইন প্রয়োগ, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক সতর্ক বার্তা। পুলিশের এ অভিযান শুধু চারটি হোটেল বন্ধ নয়, বরং নগরীর নৈতিক ও সামাজিক কাঠামো পুনর্গঠনের এক সূচনা বলেই অনেকেই দেখছেন।

অভিযানের পর শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, পাশাপাশি পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে রাতের বেলায়। নগরবাসী আশা করছেন, এই পদক্ষেপ যদি ধারাবাহিকভাবে চলে, তবে সিলেট ফিরে পাবে তার পুরনো শান্ত ও নিরাপদ নগরীর চেহারা—যেখানে অপরাধ নয়, মানবিকতার আলোয় আলোকিত হবে প্রতিটি রাস্তা ও মোড়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত