তিন বছরেই জরাজীর্ণ সিলেটের আধুনিক বাস টার্মিনাল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
তিন বছরেই জরাজীর্ণ সিলেটের আধুনিক বাস টার্মিনাল

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫।  একটি বাংলাদেশ ডেস্ক / একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সিলেটের নবনির্মিত কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল—যে স্থাপনাটিকে একসময় বলা হয়েছিল দেশের সবচেয়ে সুন্দর ও আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন টার্মিনাল—তা আজ তিন বছর না যেতেই জরাজীর্ণ ও অব্যবস্থাপনার চিত্রে ভরপুর। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাটি আজ ময়লা-আবর্জনা, ভাঙা চেয়ার, ঝুলন্ত ফ্যান, খসে পড়া পলেস্তারা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিণত হয়েছে।

যাত্রীদের বসার জন্য রাখা চেয়ারের অর্ধেকই ভেঙে গেছে, কিছু চুরি হয়ে গেছে। খসে পড়েছে লাইট ও সিলিং ফ্যান। দেয়ালের পলেস্তারা খুলে পড়ছে, আর টয়লেটের অবস্থা বর্ণনাতীত। ভিআইপি লাউঞ্জে ধুলো, জাল আর মাকড়শার রাজত্ব। কোথাও কোথাও কাচের জানালায় লেগে আছে নির্বাচনী লিফলেট, দেয়ালে ঝুলছে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের পুরনো পোস্টার।

প্রায় ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। কিন্তু আজও এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি। তিন বছর না পেরুতেই পুরো স্থাপনাটি ভগ্নদশায় পরিণত হয়েছে। অথচ উদ্বোধনের সময় একে বলা হয়েছিল দেশের সবচেয়ে আধুনিক ও নান্দনিক টার্মিনাল, যার নকশায় সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কিন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি ও আসাম প্যাটার্নের বাংলোর স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয় করা হয়েছিল।

মিউনিসিপ্যাল গভর্নমেন্ট সার্ভিস প্রজেক্ট (এমজিএসপি)-এর আওতায় সিলেট সিটি কর্পোরেশন ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই প্রকল্পের কাজ শুরু করে। প্রায় ৮ একর জমির ওপর নির্মিত টার্মিনালের জন্য বরাদ্দ ছিল ১১৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৬১ কোটি এবং ডাম্পিং গ্রাউন্ডের জন্য ৫৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়।

দৃষ্টিনন্দন এই টার্মিনালের মূল ভবনে বিমানবন্দরের আদলে আলাদা বহির্গমন ও আগমনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নির্মিত গোলাকার পাঁচতলা টাওয়ারে ছিল প্রশাসনিক কার্যালয়, কন্ট্রোল রুম, পুলিশ কক্ষ ও পর্যটন অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা। এছাড়া ছিল প্রশস্ত পার্কিং, রেস্টুরেন্ট, ফুড কোর্ট, নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক শৌচাগার, ব্রেস্ট ফিডিং জোন, স্মোকিং জোন, ছোট দোকান, অসুস্থ যাত্রীদের জন্য সিক বেড, প্রার্থনার জায়গা এবং আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

কিন্তু আজ বাস্তবে সেই সৌন্দর্য ও আধুনিকতার কোনো ছাপ আর নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশাল টার্মিনালজুড়ে যাত্রীদের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে। দিনের বেশির ভাগ সময় ভবনটি ফাঁকা থাকে। কিছু স্থানে ভাঙা বেঞ্চ, কোথাও চেয়ারহীন স্ট্যান্ড, আবার কোথাও দরজা-জানালাহীন কাচের প্রবেশপথ—সব মিলিয়ে এক পরিত্যক্ত ভবনের আবহ।

পরিবহন মালিক সমিতির সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম আহমদ ৫৬ লাখ টাকায় এক বছরের জন্য টার্মিনালটি ইজারা নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন আরও কয়েকজন পরিবহন নেতা। তাদের দাবি, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সীমিত পর্যায়ে তাঁদের, বড় কোনো সংস্কার বা পুনর্গঠনের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের।

ইজারাদার সেলিম আহমদ বলেন, “আমরা নিয়মিত তদারকি করছি, কিন্তু কিছু জায়গায় সমস্যা আছে। বড় ধরনের সংস্কারের জন্য সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতা প্রয়োজন। শিগগিরই সমন্বয় করে সংস্কারকাজ শুরু হবে।”

অন্যদিকে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার বলেন, “টার্মিনালটি এখন ইজারাদারদের কাছে দেওয়া হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা তাদের দায়িত্ব। তবে বড় কোনো সমস্যা হলে সিটি কর্পোরেশন বিষয়টি দেখবে।”

কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। গোলাকার পাঁচতলা টাওয়ারে এখন তালা ঝুলছে, কোনো কক্ষেই কার্যক্রম চলছে না। কন্ট্রোল রুম ও সিসিটিভি মনিটরিং কক্ষ তালাবদ্ধ। একসময় যে টাওয়ারে পুলিশ ও পর্যটন অফিস চালুর পরিকল্পনা ছিল, সেটি এখন ধুলোয় ঢেকে গেছে।

টার্মিনালের অভ্যন্তরে কিছু স্থানীয় রুটের বাস কাউন্টার চালু থাকলেও, সিলেট বিভাগের দীর্ঘপথের বাস কাউন্টারগুলো এখনো পুরনো কদমতলী রাস্তায়। যাত্রীরা এখনো পুরনো টার্মিনাল ও রাস্তার পাশে থাকা কাউন্টারকেই বেশি ব্যবহার করছেন।

সিলেট বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম জানান, “টার্মিনালটি চালুর পর থেকে সিটি কর্পোরেশন তদারকি করছে না। অনেক জায়গায় জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। ইজারাদার ও সিটি কর্পোরেশন—দু’পক্ষেরই গাফিলতির কারণে এখন এই অবস্থা।”

প্রায় সাড়ে ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যের বহির্গমন ভবনে একসঙ্গে ৪৮টি বাস দাঁড়ানোর মতো জায়গা রয়েছে। ৯৭০ আসনের বিশাল যাত্রী হল, ৩০ আসনের ভিআইপি কক্ষ, ৩০টি টিকিট কাউন্টার এবং নামাজের আলাদা স্থান থাকা সত্ত্বেও সবকিছু এখন অচল অবস্থায়। টয়লেট সেবা টাকার বিনিময়ে চালু থাকলেও তা অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন।

প্রবাসীদের জন্য এনবিআরের নতুন সুবিধা

যাত্রীদের অভিযোগ, টার্মিনালটি চালু হলেও সেবা পাচ্ছেন না তাঁরা। পরিবেশও অস্বস্তিকর। এক যাত্রী বলেন, “এত বড় টার্মিনাল বানিয়ে কী লাভ, যদি ব্যবহারই না হয়? বসার জায়গা নেই, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নেই। রাতে আলো জ্বলে না।”

সিলেট নগরীর নাগরিক সংগঠনগুলোর নেতারাও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত এই টার্মিনাল আজ প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

সব মিলিয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের চিত্র এক হতাশার গল্প। যে স্থাপনা একসময় সিলেটের গর্ব ছিল, আজ সেটি দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর গাফিলতির এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—কোথায় সেই প্রতিশ্রুত আধুনিক সেবা, কোথায় সেই নান্দনিক সৌন্দর্যের বাস্তব প্রয়োগ? তিন বছরেই যে স্থাপনা এমন ভগ্নদশায় পৌঁছায়, তার স্থায়িত্ব, তদারকি আর জবাবদিহি—সব কিছু নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছে সিলেটবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত