জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন লাভ করে মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে ষড়যন্ত্র, ভাঙন, ফেটে পড়ার হুমকিতে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে দলীয় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে একাধিক প্রশ্ন উভয় দিকেই উত্থাপিত হয়েছে: এই দল কতটুকু নির্ভরযোগ্যভাবে সামনে এগোতে পারে? কেবল হাসনাত, সার্জিস অথবা নাহিদ-নাহিদদের দলে দলে বিশিষ্ট নেতাদের ওপর ভরসা করে কতদূর যাবে? নাকি একটি সুসংগঠিত নীতিনির্ধারক-পরিকল্পনাবিহীন দলই হয়ে উঠেছে?
এনসিপি ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। দলের নাম ঘোষণার দিনে রাজধানীর মণিক মিয়া এভিনিউতে হাজারো তরুণ সমর্থকের জমায়েত হয়। উদ্বোধনী ভাষণে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন “দ্বিতীয় গণতন্ত্র” ও “নতুন সংবিধান” প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে।
দল ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিল গ্রিডের বাইরে থেকে একটি বিকল্প গড়ে তোলা হবে — ছাত্র-জনতার তত্ত্বাবধানে, দলীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন, পারদর্শী ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। The
চিন্তার বিষয় হলো, গঠনগত মাত্রাতে সংগঠন ও নিয়ম-নীতি এখনো মজবুত হয়নি। মার্চে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলীয় সংবিধি ও আচরণবিধির অভাবে ভেতরে রণজঙ্গল তৈরি হয়েছে।বোর্ডরুম থেকে মাঠ পর্যায়ে একাধিক নেতা নিজস্ব ভাষ্য দিয়ছেন — দল মূলত নিয়ন্ত্রণ-বাদী হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ কর্মীরা পিছিয়ে পড়ছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, দলীয় প্রবক্তা ও নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্যে মতবিরোধের তথ্যও রয়েছে। যেমন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: “ভিতরে ভাঙন, বাড়ছে একাকীত্ব, এনসিপির গুরুত্বপূর্ণ দাবি এগোচ্ছে না।”
মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে এক ধরনের ধাপ দেখা যাচ্ছে — বিরোধীরা বলছেন, এ দলের তত্ত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গা মূলত কয়েকজন বড় নেতার আশ্রয়ে। সাধারণভাবে প্রশ্ন উঠছে, দলীয় মেচুরিটি কোথায়? নীতিনির্ধারক-পর্যায়ে কতটা যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
ছাত্র আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা একাধিক নেতা এখন সংগঠন ছাড়ার কথা ভাবছেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে খুলনায়। যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা নেই, তবে সামাজিক মাধ্যমে আহম্মদ হামিম রাহাতের একটি পোস্ট ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যেখানে তিনি এনসিপির অভ্যন্তরীণ বিভেদ, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা, তৃণমূল কর্মীদের অবমূল্যায়ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
এই ধরণের মনোবলহ্রাস বাড়তি প্রমাণ যে, দল শুধু উচ্চবাগ্মী বক্তব্য দিয়ে এগোছে না — মাঠ-সংগঠন, কর্মী মনোবল, অসময়ে বাধাপ্রাপ্ত সিদ্ধান্তগ্রহণ এসব জায়গায় সংকট রয়েছে।
এনসিপিতে শুধু অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, রাজনৈতিক বাহ্যিক ফ্যাক্টরও কাজ করছে। দল বারবার বলছে যে, বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা-আশ্রিত কয়েকজন তাদের দলে যোগাযোগ রাখছেন যা রাজনৈতিক স্বচ্ছতায় প্রশ্ন ফেলে। যেমন, বাংলাদেশ জাতীয়ist দল (বিএনপি) এক নেতা অভিযোগ করেছে যে, সরকারের উপদেষ্টার মধ্যেই এনসিপি-সমর্থক ব্যক্তি রয়েছেন, যা সরকারের নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে, এনসিপি নিজেই বলছে, তারা মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও “দ্বিতীয় গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে — তাদের অভিযোগ, পুরনো রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়া চলছে, যা তারা কখনো মেনে নেবে না।
খুলনায় এনসিপির একাধিক নেতা ও শতাধিক কর্মীর দল ছাড়ার ভাবনায় রয়েছে — এমন খবর রাজনৈতিক মহলে ছড়িয়েছে। দল এ দুর্নীতির অভিযোগ, নেতৃত্বহীনতা এবং কর্মীদের অংশগ্রহণ-সংক্রান্ত ঘাটতির কথাও মুখ খুলছে। শুধু তাই নয়, একটি পোস্টে আহম্মদ হামিম রাহাত বলেন, “মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মতামত ছাড়া হঠাৎ করেই এনসিপি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভেদ, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা ও তৃণমূল নেতৃত্বে অবমূল্যায়ন।”
দল একসময় সামাজিক আন্দোলনের কোনও দল ছিল — এখন তা কি রাজনৈতিক দল হিসেবে শক্তিশালীভাবে দাঁড়াতে পারছে? নাকি দলীয় স্বরূপ পরিবর্তনের কারণে কর্মীরা ভাবছেন নতুন বিকল্প খুঁজে নেবেন?
দলীয় ইতিহাসে দেখা গেছে — নতুন রাজনৈতিক দল সাফল্য লাভ করে তখনই, যখন নেতৃত্ব শুধুই বড় দলে দলে না গড়ায়, বরং ব্র্যান্ড, কর্মীসংগঠন, স্থানীয়-সংযুক্তি, আর ওপরে থেকে নিচে পর্যন্ত সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া মজবুত হয়। এনসিপি এই চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে তারা দাবি করছে — পুরনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোতে দায়িত্বপ্রবণতা, স্বচ্ছতা, গণমুখীতা নেই। অন্যদিকে, তাদের নিজেই এখন সেই ‘নতুন রাজনীতি’যাত্রায় কাঙ্খিত গতি পাচ্ছে না। অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, নেতাদের বিচ্ছিন্নতা ও সংগঠন-খারি অবস্থা এটি প্রমাণ করেছে।
তবে সম্ভাবনার দিক রয়েছে। তরুণ নেতৃত্ব, নীরব বঞ্চিত শ্রেণির প্রতি আপোষহীন অবস্থান এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি — এসব বিষয় এখনও জনমতের দিকে যেকোনো মুহূর্তে কর্মবদ্ধ হতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাবনাকে দল কতটুকু বাস্তবায়নে পরিণত করতে পারবে।
এনসিপি-র সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ তিনটি প্রশ্ন রয়েছে: প্রথমত, সংস্থাগত ভিত্তি কতটুকু দৃঢ় হবে? দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্তগ্রহণ ও নেতৃত্ব-সংগঠন কি লোভ-আলোচনায় আটকা পড়বে না? তৃতীয়ত, হাসনাত-নাহিদ-সার্জিসদের দুই বা তিনজন বড় নেতার চারপাশে দলকে কেন্দ্র করে এটি কি সত্যিকারে ‘জনগণমুখী বিকল্প’ হতে পারবে?
পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে সময় খুবই কম। ওই সময়ের মধ্যে দলীয় অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান ও ভাবমূর্তি পরিবর্তনের দিকে দ্রুত নজর দিতে হবে। নইলে, “ছাত্র-আন্দোলন” থেকে “নতুন রাজনৈতিক দল” হয়ে ওঠার পথে এনসিপি হয়তো নিজেই বিবিক্তভাবে পথ হারাতে পারে।