“গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক ফখরুলের”

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৫ বার
“গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক ফখরুলের”

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দৈনিক নয়া দিগন্তের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর  বলেন, “ফ্যাসিবাদী সরকারের দমন-পীড়নে আমাদের ৬০ লাখ কর্মীর নামে মিথ্যা মামলা হয়েছে। ২০ হাজারের বেশি নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ড ও গুমের শিকার হয়েছেন। জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক আলেম-ওলামাকে মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে, বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার এক ভয়ংকর নীতি অনুসরণ করছে, যা দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, “আজকে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে কাজ করতে পারছেন না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুরোপুরি রুদ্ধ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভিন্নমত দমন এখন সরকারের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।”

জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক আলেম-ওলামাকে মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

তিনি ১৯৭৫ সালের ঘটনাবলির কথা স্মরণ করে বলেন, “বাকশাল আমলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তখন অনেক সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়েছিলেন, কেউ কেউ হকারি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।” ফখরুলের ভাষ্য অনুযায়ী, ইতিহাস আজ আবারও যেন সেই অন্ধকার সময়ের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। সংস্কার সনদে স্বাক্ষরিত দলগুলোর ঐক্যের মাধ্যমে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই।” তিনি বলেন, দেশের জনগণ আজ পরিবর্তন চায়, আর সেই পরিবর্তনের পথ হলো একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন।

ফখরুল বলেন, “আমরা চাই সব দল নির্বাচনে অংশ নিক, জনগণ যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে। গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারে এটাই আমাদের অঙ্গীকার।” তিনি দাবি করেন, বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনতেই তাদের লড়াই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফখরুলের বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, বরং এটি দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। বিএনপি ইতিমধ্যে বেশ কয়েক মাস ধরে মাঠে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, আর আগামী নির্বাচনের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় দলটি নতুন করে ঐক্য গঠনের চেষ্টা করছে। দলটির ‘সংস্কার সনদ’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে তারা নতুন জোট ও রাজনৈতিক সহযোগিতা তৈরি করতে চায়, যাতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নির্বাচনী সংস্কার নিশ্চিত করা যায়।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন সাংবিধানিক সময়সূচি অনুযায়ীই হবে এবং তা কমিশনের অধীনেই পরিচালিত হবে। সরকারের দাবি, দেশে এখন উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের ধারা অব্যাহত আছে। কিন্তু বিএনপি বলছে, উন্নয়নের নামে ক্ষমতার একচেটিয়া দখল চলছে, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

ফখরুল তাঁর বক্তব্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গেও বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, “আজকের সংবাদমাধ্যমও নানা প্রকার নিয়ন্ত্রণ ও চাপের মধ্যে রয়েছে। সাংবাদিকদের ভয় দেখানো হচ্ছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে। স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না।” তিনি উল্লেখ করেন, জিয়াউর রহমান সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনে একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, অথচ বর্তমানে সেই ঐতিহ্য বিনষ্ট হচ্ছে।

বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারা আসন্ন নির্বাচনের জন্য কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। তিনি বলেন, “এই আন্দোলন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য নয়, এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। আমরা বিশ্বাস করি জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।”

অনুষ্ঠানের শেষ অংশে ফখরুল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে নয়া দিগন্ত পরিবারকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, “নয়া দিগন্ত গত দুই দশক ধরে সত্য প্রকাশে সাহস দেখিয়েছে। আমরা চাই বাংলাদেশে এমন সংবাদপত্র আরও এগিয়ে আসুক।”

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্যের তাৎপর্য কম নয়। ২০২৫ সালের শেষ ভাগে এসে যখন সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ফখরুলের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপি তাদের আন্দোলনের নতুন রূপরেখা প্রকাশ করল। একই সঙ্গে, তিনি যে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-কে নির্বাচনকাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তা এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সময়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম—সকলের ভূমিকা আগামী মাসগুলোতে নির্ধারণ করবে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু নির্বাচনের আয়োজন নয়, তার পরিবেশ, স্বচ্ছতা ও নাগরিক স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ফখরুলের এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু সরকারের সমালোচনা নয়, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিতও রয়েছে। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়েই দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ খুলতে পারে। তবে এর জন্য দরকার পারস্পরিক সহনশীলতা, আইনের শাসন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা।

একটি দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলা ছাড়া গণতন্ত্র স্থায়ী হতে পারে না—এই বার্তাই যেন মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের মর্ম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনগণের ঐক্য ও সচেতনতার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ আবারও গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত