প্রকাশ: শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫। নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গত ২৩ অক্টোবর সন্ধ্যা আটটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত বল্গবান এলাকায় অবস্থিত সেনাভবনে জটিল ও একযোগে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমন তথ্য সামাজিক মাধ্যমে অনলাইন এক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য্য তার একটি ফেসবুক পেইজে তুলে ধরেছেন যা দ্রুত সামাজিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী মেজর জেনারেল (অবঃ) ফজলে এলাহী আকবর সহ এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে নিয়ে সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার কে নিয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকের সত্যতা বা বিষয়বস্তু স্বাধীনভাবে কোনো স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমে এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তথাপি, বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সেনা-রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে ইতিমধ্যে জনসাধারণের মধ্যে রুদ্ধশ্বাস আলোচনা শুরু করেছে।
পিনাকী তার দেয়া সূত্রে থেকে জানিয়েছেন, গত ১৪ মাসের মধ্যে বিএনপি ও জেনারেল ওয়াকার উভয়ের মধ্যে একাধিক গোপন বৈঠক হয়েছে, এমন দাবি পোস্টে করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, এই সাক্ষাৎ কি শুধু রাজনৈতিক আলোচনা ছিল কি, কিংবা অন্তর্ভুক্ত ছিল আরও গভীর কোনো কৌশলগত আঁচ? পোস্ট অনুযায়ী, বৈঠকে দুইটি বিশেষ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রথমত, জেনারেল ওয়াকার সাংগঠনিকভাবে পরিকল্পনা করছেন যে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি রিফাত আহমেদ এর নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার পর দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করবেন। দ্বিতীয়ত, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার অংশীদারদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দিয়েছেন। তাছাড়া জনপ্রশাসন ও পুলিশের মধ্যকার বিশ্বাসযোগ্য অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ এবং লাভজনক পদে বসিয়ে দেওয়া হবে এবং ওই নির্বাচনে জেনারেল ওয়াকার কাছে বিএনপি সমর্থন চাবে।
এই দাবিগুলো সত্য কিনা, অথবা কেবল গুঞ্জন ও কল্পনা-ভিত্তিক আলোচনার অংশ কিনা- এটা স্পষ্ট নয়। তবে কিছু বিষয় গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, সাধারণ সমাজে সেনা ও রাজনৈতিক দলীয় নেতৃবৃন্দের এমন গোপন আলোচনায় অংশ গ্রহণের বিষয়টি পুরনো নয়; সাম্প্রতিক এক এক নিবন্ধে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সেনা প্রধান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তারা “রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থাকবেন” এবং দেশ পরিচালিত হবে শুধুমাত্র নির্বাচিত সরকারের অধীনে। কিন্তু দেখা যায়, সেনা-রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে জনমানসে সন্দেহ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিএনপি ও রাজনীতি সংক্রান্ত আলোচনায় দলটি বেশ সক্রিয়; তারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন কাজে অংশ নিচ্ছে, যেমন ইইউ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, ওই সেনাভবনে বৈঠকের দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে তা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি বড় ইঙ্গিত হতে পারে। তবে এখানে কিছু প্রশ্নও উত্থাপিত হয় যে কেন ভবনে প্রবেশের মূল রাস্তা বা আগমনের সাধারণ প্রক্রিয়া ব্যবহার না করে, পিনাকী ভট্টাচার্য্যের পোস্ট অনুযায়ী বৈঠকটি ছিল “পেছনের দরজা দিয়ে” অর্থাৎ সেনাভবনের পাশে অবস্থিত কুর্মিটোলা গলমূল ক্লাবের পেছনের রাস্তা বেছে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের গোপন বৈঠক সাধারণভাবে দেখা যায় না এবং এটি একদিকে সন্দেহ উঁচিয়ে দেয় যে বৈঠকদের মূল উদ্দেশ্য কি মাত্র রাজনৈতিক আলোচনা ছিল, নাকি তার চেযেও বেশি কিছু। তবে পিনাকী ভট্টাচার্য্য তার পোস্টটিতে উল্লেখ রয়েছে যে “সৈনিক ও জুনিয়র অফিসাররা সকল ষড়যন্ত্রকারীদের সকল খায়েশ মিটাবো!” এটি সামাজিক উত্তেজনা ও ষড়যন্ত্র-প্রবণ ধারণার রূপায়ণ।
সংবাদটি যাচাই-পর্বে আমরা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাইনি যা নিশ্চিত করে যে উল্লিখিত সেনা প্রধান ‘জেনারেল ওয়াকার’ কি সত্যিই সেনাভবনে বৈঠকে ছিলেন। এছাড়া বিএনপি মুখপাত্র বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা কিংবা সামরিক বাহিনী-প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আমরা খুঁজে পাইনি। তাই, তথ্যটি একাধিক মুল্যায়ন, যাচাই ও প্রেক্ষাপটসহ বিবেচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক দলীয় নেতাদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত অসংখ্য সংলাপ বা ‘প্রস্তুত আলোচনা’ হয়ে থাকে। তবে সেটি সাধারণভাবে সবসময় প্রকাশ্য হয় না। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়াতে এমন গোপন বৈঠকের বিষয়টি জনসাধারণের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাড়ায়। দেশের সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, নির্বাচন, প্রশাসন ও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হয়েছে, যদি রাজনৈতিক দল ও সেনাবাহিনী একসঙ্গে অবৈধভাবে পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা সুশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হতে পারে।
বর্তমানে দেশে একদিকে চলছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা, এবং সেনাবাহীন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলোও জনসাধারণের নজরে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যেমন সংবাদমাধ্যম ও দায়িত্বশীল নীতি-নির্ধারকদের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিগুলোর উপরেও কড়া নজর রাখা প্রয়োজন।
কারণ এই সংবাদটি ইতিমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, এবং যদি তা সত্য হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসাবেই বিবেচিত হবে।