প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে নির্বাচন নিয়ে নতুন করে আইন তৈরি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল। তিনি বলেন, “নির্বাচন নিয়ে যখন সবাই কথা বলছে, তখনই নির্বাচনটি কিভাবে হবে—সে বিষয়ে একটি নতুন আইন তৈরি হয়েছে। নির্বাচন যে আইনের অধীনে হয়, সেটিকে বলা হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা ইংরেজিতে সংক্ষেপে আরপিও (Representation of the People Order)। এই আরপিও সংশোধন করে উপদেষ্টা পরিষদের ক্যাবিনেট কমিটিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এখন এটি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে, স্বাক্ষর হলেই এটি অধ্যাদেশ হিসেবে কার্যকর হবে।”
সম্প্রতি নিজের ইউটিউব চ্যানেলের একটি বিশ্লেষণমূলক ভিডিওতে তিনি এই বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন, নতুন সংশোধিত আরপিও কীভাবে ভবিষ্যতের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে এবং এতে কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
মাসুদ কামাল বলেন, “বর্তমানে দেশে যেসব আইন হচ্ছে, তার অধিকাংশই অধ্যাদেশ আকারে জারি হচ্ছে। কারণ, দেশে এখন কোনো সংসদ নেই। সাধারণত সংসদই আইন প্রণয়ন করে, কিন্তু সংসদ না থাকলে সরকার অধ্যাদেশ জারি করে সাময়িকভাবে সেই আইনি শূন্যতা পূরণ করে। প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশে সই করে দিলেই সেটি কার্যকর হয়। পরবর্তীতে যখন নতুন সংসদ গঠিত হবে, তখন সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব হবে এই অধ্যাদেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনে রূপান্তর করা অথবা বাতিল করা। সংসদ যদি কোনো অধ্যাদেশ প্রত্যাখ্যান করে, তবে সেটি আর আইন হিসেবে বহাল থাকবে না।”
তিনি বলেন, “আরপিও-তে কিছু নতুন ধারা সংযোজন হয়েছে, আবার পুরনো কিছু ধারাও রাখা হয়েছে। তবে নতুন সংযোজনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে প্রবাসীদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত পরিবর্তন। আগে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা ভোট দিতে পারতেন না, কিন্তু এবার তারা পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ ও ইতিবাচক পরিবর্তন।”
নতুন সংশোধনের আরেকটি দিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাসুদ কামাল বলেন, “প্রার্থীদের জামানত ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই পরিবর্তনকে খুব পছন্দ করিনি। এটি অনেকের জন্য অংশগ্রহণের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী বা আর্থিকভাবে দুর্বল প্রার্থীদের জন্য। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো অংশগ্রহণ—অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ওপর তা নির্ভর করা উচিত নয়।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে এখন নির্বাচন কমিশন পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল করতে পারবে। আগে যেমন শুধু অনিয়মিত কেন্দ্রের ভোট বাতিল করা যেত, এখন কমিশন প্রয়োজনে পুরো নির্বাচনী আসনের ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা পাবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, কারণ এটি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে কমিশনকে আরও শক্তিশালী করবে।”
তার বক্তব্যে একটি মানবিক ও নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গিও উঠে আসে। তিনি বলেন, “এবার একটি ধারা যোগ হয়েছে, যা আমার মতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কেউ যদি আদালতের ফেরারি আসামি হন, অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও তিনি আদালতে হাজিরা দেন না বা পালিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। আইন ভেঙে পালিয়ে বেড়ানো একজন ব্যক্তি জনগণের প্রতিনিধি হতে পারেন না। আপনি যদি প্রকৃতভাবে জনগণের সেবা করতে চান, তাহলে প্রথমে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আদালতে হাজিরা দিন, জেলে থাকুন—জেল থেকেও প্রার্থী হওয়া যায়, কিন্তু পালিয়ে থাকা মানে দায়িত্ব থেকে পলায়ন।”
তার এই মন্তব্য সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মাসুদ কামালের বক্তব্য শুধু একটি আইনি পরিবর্তন নিয়ে নয়, বরং বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বড় বার্তা বহন করে। তিনি আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি এর নৈতিক দিক নিয়েও কথা বলেছেন, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সচরাচর দেখা যায় না।
তার ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ একে “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে ইতিবাচক বার্তা” বলে আখ্যা দিয়েছেন, আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন সরকারের এই উদ্যোগের আন্তরিকতা নিয়ে। বিশেষ করে, সংসদবিহীন অবস্থায় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনি পরিবর্তন আনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা সংশয়ও দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নতুন আরপিও কার্যকর হলে বাংলাদেশের নির্বাচনী কাঠামোতে একটি বড় পরিবর্তন আসবে। প্রবাসী ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি যেমন ভোটের পরিসর বাড়াবে, তেমনি নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করবে। তবে তারা মনে করেন, এই আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জনগণের একাংশও মনে করছেন, আইনের প্রণয়ন যতটা জরুরি, তার প্রয়োগ ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। একজন নাগরিক হিসেবে তারা আশা করছেন, নতুন আইনটি রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। কারণ, বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে যে বিতর্ক ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা অপরিহার্য।
ভিডিওর শেষাংশে মাসুদ কামাল বলেন, “আমাদের দেশের রাজনীতি এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আইনকে সম্মান করা আর আইনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া—এই দুই প্রবণতার মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। জনগণ চায় তাদের ভোটের মূল্য থাকুক, তারা চায় ন্যায্য প্রতিযোগিতা। যদি নতুন আরপিও সেই দিকেই এগিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে এটা হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক একটি অধ্যায়।”
বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এখন আগ্রহভরে অপেক্ষা করছেন—প্রেসিডেন্ট কখন অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন এবং এটি কার্যকর হওয়ার পর এর বাস্তব প্রভাব কী দাঁড়ায়। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অনেক আইন হয়েছে যা প্রণয়নের পরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়নি।
তবে মাসুদ কামালের বিশ্লেষণ বলছে, এ আইনটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক কাঠামোর সংশোধন নয়; এটি ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। তিনি মনে করেন, “যদি এই আইনের প্রতিটি ধারা সঠিকভাবে কার্যকর হয়, তাহলে জনগণ আবারও বিশ্বাস ফিরে পাবে—তাদের ভোটই হবে দেশের ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র উপায়।”
এমন সময়ে, যখন রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত, নতুন এই আরপিও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে—যেখানে আইন, ন্যায় এবং জনগণের আস্থা এক সুতোয় গাঁথা হয়ে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।