প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ এখন এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ, শহর থেকে গ্রাম—সবখানে নির্বাচনের উত্তাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাঠ পর্যায়ে দলীয় প্রচারণা শুরু হয়ে গেলেও রাজনৈতিক দৃশ্যপট ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে নির্বাচনের প্রস্তুতি ঘিরে চলছে নানা রকম হিসাব-নিকাশ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও, সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নাম নিয়ে দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। উভয়েই মনোনয়ন প্রত্যাশী এবং স্থানীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান রাখেন। তাদের মাঠে প্রচারণা ও জনসংযোগে কর্মীদের আগ্রহ নির্বাচনী আমেজকে আরও তীব্র করে তুলছে।
অন্যদিকে সিলেট-২ আসনে প্রয়াত ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী লুনা ফারহানার নামটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, তিনিই বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী হবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হুমায়ুন কবিরের পুনরাগমন ও সক্রিয় প্রচারণা সেই সমীকরণে নতুন মোড় এনে দিয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে বিএনপির প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে দেখা দিয়েছে নীরব প্রতিযোগিতা। তবে এই সব কিছুর মধ্যেই দলের অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছে অনৈক্য, যা কালকের ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকেই প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি যেন এখন এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা ও অস্বস্তির চোরাবালিতে আটকে পড়েছে। ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি—সবাই এক অজানা চাপের মধ্যে রয়েছে। সরকারের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সনদ নিয়ে অস্বস্তি যেমন স্পষ্ট, তেমনি একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতির উপরও চাপ বেড়েছে। এখন একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং সরকারের নৈতিক বৈধতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) আবারো রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছে। নতুন সংশোধন অনুযায়ী, কোনো জোটের প্রার্থীরা প্রধান দলের প্রতীকে ভোট করতে পারবেন না; প্রত্যেককে নিজ নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে। এই ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষত বিএনপির মতো দল, যারা বহু বছর ধরে জোট রাজনীতির মাধ্যমে ছোট দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন করেছে, তাদের জন্য এটি বড় ধাক্কা। কারণ, প্রতীকই বাংলাদেশের ভোট রাজনীতিতে পরিচিতি ও বিশ্বাসের প্রতীক।
বিএনপি ইতিমধ্যেই কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, ছোট দলগুলোর নিজস্ব প্রতীকে লড়াই করার ফলে তাদের বিজয়ের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। এক স্থায়ী কমিটির সদস্য জানিয়েছেন, “জোট রাজনীতির সহযোগী দলগুলো এমনিতেই মাঠে দুর্বল অবস্থানে ছিল। এখন নিজস্ব প্রতীকে লড়াই করতে হলে তাদের পক্ষে জেতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।” বিএনপি এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে সংশোধনী পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে, তবে কমিশন এখনো তার অবস্থান থেকে সরেনি।
অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। বিএনপি তাদের স্বভাবসুলভ অভিযোগ ও দাবি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে গেলেও ড. ইউনূস সোজাসাপ্টা জানিয়েছেন, তিনি নিরপেক্ষ প্রশাসন গঠন না করে দায়িত্ব ছাড়বেন না। তবে জনগণের একটি অংশ মনে করে, গত চৌদ্দ মাসে সরকার প্রশাসন পরিচালনায় যে নানা জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে, তাতে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে অবস্থানরত ও বিদেশে পলাতক ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক উপাদানগুলো এখনো সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ব্যাহত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ভারতীয় ভূখণ্ডে পালিয়ে যাওয়া অনেক প্রাক্তন আওয়ামী রাজনীতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে গোপনে ভূমিকা রাখছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে দেশে তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করাও এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। গোপালগঞ্জের মতো কিছু এলাকায় এখনো অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি। শেখ হাসিনার পতনের পরও সেখানে আওয়ামীপন্থী সন্ত্রাসীদের হামলায় বিএনপি নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের উপর হামলা হয়েছে। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব এলাকায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
গণভোট ও সংসদ নির্বাচন ঘিরেও দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা। ঐকমত্য কমিশন বহু আলোচনার পর গণভোটে একমত হলেও, কখন এটি অনুষ্ঠিত হবে তা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিএনপি চায় একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট, আর জামায়াতের দাবি আগে গণভোট, পরে নির্বাচন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি বড় প্রক্রিয়া একসাথে সম্পন্ন করা বাস্তবসম্মত নয় এবং এতে ভোটারদের বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনকালীন সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। প্রশাসনের ভেতরে যে দলীয় প্রভাব এখনো রয়ে গেছে, তা নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে বড় বাধা। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মতো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা এখনো দেশের জনগণের মধ্যে প্রবল। কিন্তু তখনকার তুলনায় এখনকার পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল, এবং পরাজিত দল নির্বাচনের ফল অস্বীকার করলে দেশ আবারও অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।
ড. ইউনূস রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন । অথচ এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে স্থিতিশীল করা। যদি কোনো কারণে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার দায় পুরোপুরি সরকারের ওপর বর্তাবে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দু’দুবার রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ হারিয়েছে—একবার ১৯৭২ সালে এবং আবার ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর। এখন, জুলাই বিপ্লবের পর নতুন করে জাতি আবারও একটি সুযোগ পেয়েছে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, মানবিক রাষ্ট্র গড়ার। তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ঋণ শোধ করতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। জাতি তৃতীয়বারের মতো ব্যর্থতার মুখ দেখতে চায় না।
বাংলাদেশের রাজনীতির এই সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, সংযম ও সমঝোতা। অন্যথায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়ে আবারও দেশ পড়তে পারে অচলাবস্থা ও সহিংসতার গভীর অন্ধকারে।