১০ জনের দল নিয়েও রোনালদোদের বিদায়ঘণ্টা বাজাল বেনজেমার আল ইত্তিহাদ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
হতাশায় শুরু রোনালদোর নতুন বছর, আল নাসরের জয়ের ধারা থামাল আল আহলি

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের ফুটবল অঙ্গনে দুই বিশ্বতারকার লড়াই মানেই এক অন্যরকম উত্তেজনা। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বনাম কারিম বেনজেমা—এই নাম দুটি ফুটবল ইতিহাসে একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে বহুবার, তবে এবার তারা মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রতিপক্ষ হিসেবে। সৌদি কিংস কাপে সেই লড়াইয়ের শেষ হাসি হেসেছেন ফরাসি স্ট্রাইকার বেনজেমা। ১০ জনের দল নিয়েও তার দল আল ইত্তিহাদ ২–১ ব্যবধানে হারিয়েছে রোনালদোর আল নাসরকে, আর এই হারেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছে রোনালদোর দলকে।

মৌসুমের শুরুটা একেবারেই মনমতো হয়নি আল ইত্তিহাদের। পারফরম্যান্সের ওঠানামা, ইনজুরি এবং কোচ পরিবর্তনের কারণে দলটি বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। তবে নতুন কোচ সার্জিও কনসেইসাওয়ের অধীনে দলটিতে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। এই ম্যাচে সেটির প্রতিফলন ঘটেছে মাঠে। খেলার শুরু থেকেই আল ইত্তিহাদ দাপট দেখায়, এবং প্রথম গোলটি এনে দেন দলের প্রাণভোমরা বেনজেমা। গোলের মুহূর্তে যেন দেখা মেলে তার পুরনো রিয়াল মাদ্রিদ-দিনের সেই তীক্ষ্ণ ফিনিশিংয়ের।

গোল খাওয়ার পরই জেগে ওঠে রোনালদোর আল নাসর। একের পর এক আক্রমণে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে চাপ বাড়ায় তারা। অবশেষে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড অ্যাঞ্জেলো বক্সের ভেতর থেকে রিবাউন্ডে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। তখন মনে হচ্ছিল, খেলা আবারও রোনালদোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।

প্রথমার্ধের শেষদিকে আলজেরিয়ান মিডফিল্ডার হুসেম আওয়ার ঠাণ্ডা মাথায় গোলরক্ষক প্রেড্রাগ রাজকোভিচকে পরাস্ত করে আল ইত্তিহাদকে আবারও এগিয়ে দেন। এই গোলে যেন স্তব্ধ হয়ে যায় আল নাসরের দর্শকরা। মুহূর্তের মধ্যেই ম্যাচের গতি পাল্টে যায়, আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় আল ইত্তিহাদ।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই নাটকীয়তা যোগ হয় ম্যাচে। আল জুলায়দান লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আল ইত্তিহাদ। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে রোনালদোরা হয়তো সহজেই ম্যাচে ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। ১০ জন নিয়েই দুর্দান্ত রক্ষণ গড়ে তুলে একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করেছে আল ইত্তিহাদ। গোলরক্ষক মার্সেলো গ্রোয়েহের অনবদ্য পারফরম্যান্স যেন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল রোনালদোর প্রতিটি প্রচেষ্টার সামনে।

পুরো ম্যাচে আল নাসর নেয় ২২টি শট, যার মধ্যে পাঁচটি লক্ষ্যে ছিল। কিন্তু তবুও কোনো গোল আসেনি রোনালদোর পা থেকে। শেষদিকে হতাশা চেপে রাখতে পারেননি এই পর্তুগিজ সুপারস্টার। ৯০ মিনিট শেষে তিনি মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়েন, মুখে ছিল স্পষ্ট অসন্তোষের ছাপ। এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সৌদি কিংস কাপ থেকে ছিটকে গেল তার দল, যা রোনালদোর জন্য বড় এক ধাক্কা।

তবে এই হার সত্ত্বেও আল নাসর এখনো সৌদি প্রো লিগের শীর্ষে আছে, টানা ছয় ম্যাচে জয়ের ধারায় তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করে রেখেছে। কিংস কাপের ব্যর্থতা তাদের লিগের গতি ব্যাহত করবে না বলেই আশা করছে সমর্থকরা। রোনালদো নিজেও ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের মনোবল চাঙা করার চেষ্টা করেছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, এই জয় আল ইত্তিহাদের জন্য ছিল এক ধরনের পুনর্জন্ম। মৌসুমের শুরুতে ব্যর্থতা আর সমালোচনার চাপে থাকা দলটি এই জয়ের মধ্য দিয়ে যেন নিজেদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল। কিংস কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর বেনজেমা বলেন, “আমরা জানতাম ম্যাচটা সহজ হবে না। রোনালদো দারুণ খেলোয়াড়, তার বিপক্ষে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু আমরা দল হিসেবে খেলেছি, সেটাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।”

বেনজেমার এই পারফরম্যান্স আবারও প্রমাণ করেছে, বয়স কেবল সংখ্যা মাত্র। ইউরোপ ছাড়ার পর অনেকে ভেবেছিলেন, সৌদি লিগে তার প্রভাব কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো—এখনো তিনি প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। ফিনিশিং, পজিশনিং আর অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে তিনি আবারও দেখিয়েছেন কেন তিনি এখনও বড় মঞ্চের খেলোয়াড়।

আল ইত্তিহাদের কোচ সার্জিও কনসেইসাও বলেন, “আমাদের খেলোয়াড়রা নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়েছে। ১০ জন নিয়েও আমরা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ ধরে রেখেছি। এটা শুধুমাত্র ট্যাকটিক্সের জয় নয়, মানসিক দৃঢ়তারও উদাহরণ।”

রোনালদোর দল আল নাসরের জন্য এই হারের পর পর্যালোচনার সময় এসেছে। ডিফেন্সে দুর্বলতা, মিডফিল্ডে বল ধরে রাখার ব্যর্থতা এবং সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার খেসারত দিতে হয়েছে তাদের। সৌদি ফুটবলে এই দলটি যেমন জনপ্রিয়, তেমনি সমালোচনাও তাদের ঘিরে থাকে বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, “রোনালদো এখনো দলের প্রাণ, কিন্তু দলকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে। তার ওপর নির্ভরতা যতটা কমবে, আল নাসর ততটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।”

ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ম্যাচটি শুধু একটি জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, বরং দুই কিংবদন্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন অধ্যায়। রিয়াল মাদ্রিদে বহু বছর পাশাপাশি খেলার পর এই দুই তারকার প্রতিপক্ষ হয়ে নামা যেন ছিল এক আবেগঘন দৃশ্য। মাঠে রোনালদো আর বেনজেমা ভিন্ন ভিন্ন জার্সিতে, কিন্তু দুজনেরই চোখে ছিল একই আগ্রহ—জয়।

অবশেষে জয়ী হয়েছেন বেনজেমা। ১০ জনের দল নিয়েও তার নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাসই গড়ে দিয়েছে পার্থক্য। আর রোনালদোর জন্য এই পরাজয় হয়তো এক নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা, যেখানে তাকে আবারও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে পরের ম্যাচেই।

সৌদি ফুটবলে এই লড়াই প্রমাণ করল, তারকাদের নামের ঝলকানি যেমন দর্শক টানে, তেমনি মাঠের লড়াই এখনো রয়ে গেছে অনিশ্চয়তায় ভরপুর। যেখানে অভিজ্ঞতা, কৌশল ও মানসিক দৃঢ়তাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে কে হাসবে শেষ হাসি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত