প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী দেশের মধ্যে অন্যতম ভারত। মাঠের ভিতরে ভারতীয় দলের দাপট স্বাভাবিকভাবে চোখে পড়ে, কিন্তু মাঠের বাইরে এই দেশের প্রভাব আরও গভীর। এবার সেই প্রভাবকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সাবেক আইসিসি ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড। ব্রডের ভাষ্য অনুসারে, ভারতীয় ক্রিকেটের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির অনুরোধ এবং আইসিসির অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে মাঠের নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক ইংলিশ ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড জানান, এক আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতীয় দল নিয়ম অনুযায়ী তিন-চার ওভার পিছিয়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে এর জন্য দলের বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান ছিল। কিন্তু ম্যাচ শেষে তিনি একটি ফোন কল পান, যেখানে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়—ভারতকে শাস্তি দেওয়া না হোক এবং কিছুভাবে সময় বের করতে হবে। ব্রড বলেন, “আমি ভাবলাম, ঠিক আছে, কোনোভাবে সময় বের করতে হবে। আমরা কিছু সময় বের করলাম, যাতে শাস্তির সীমা অতিক্রম না করে।”
ক্রিস ব্রড আরও উল্লেখ করেন, পরবর্তী ম্যাচেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এবার এর পেছনে ছিলেন সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। ব্রড বলেন, “সৌরভ কোনও ‘হারি-আপ’ সংকেত মেনে চলছিল না। আমি ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, এবার কী করতে হবে? আমাকে বলা হলো, এবার ওকে করো, অর্থাৎ শাস্তি দাও।” এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণেও ভারতের প্রভাব কতটা দৃঢ় এবং কখনো কখনো তা নিয়মের সঠিক প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
ক্রিস ব্রডের বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, নিজের সৎ নীতির প্রতি অটল থাকা কখনো কখনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন তৈরি করে। তিনি বলেন, “আমি এমন একজন যে সব সময় ভুল এবং সঠিকের মধ্যে পার্থক্য মানি। কিন্তু বিশ্বের কিছু জায়গায় ঠিক এবং ভুলের দূরত্ব অনেকটা গঙ্গা নদীর মতো। অনেক নোংরা পানি ভেতরে বয়ে যায় এবং আপনাকে তা মোকাবিলা করতে হয়। আমার মতো যারা ন্যায় এবং সত্যে বিশ্বাসী, তাদের জন্য ২০ বছর ধরে সক্রিয় রাজনীতির মধ্যে টিকে থাকা একটা বড় পরীক্ষা।”
ক্রিস ব্রড ২০০৩ থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইসিসির ম্যাচ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অধীনে ১২৩ টেস্ট, ৩৬১ একদিনের আন্তর্জাতিক (ওয়ানডে) এবং ১৩৮ টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে মোট ৬২২ আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। তিনি শুধুমাত্র একজন রেফারি নয়, বরং ক্রিকেট নীতিশাস্ত্রে সততা এবং সঠিকতার প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
ক্রিস ব্রডের আরেকটি পরিচয় হলো ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্টুয়ার্ট ব্রডের বাবা। স্টুয়ার্ট ব্রডের মতো ক্রিকেটপ্রেমীরা তার নীতি এবং সততার কারণে তাকে অত্যন্ত সম্মান জানায়। তার অভিজ্ঞতা এবং অভিমত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ন্ত্রকদেরও সতর্ক করে দিচ্ছে যে, মাঠের বাইরে রাজনৈতিক প্রভাব বা দেশীয় সুবিধা কোনোভাবেই খেলার ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করা উচিত নয়।
আইসিসির সাবেক এই রেফারি আরও বলেন, “ভালো নিয়ম মানা এবং মাঠের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের মতো দেশের প্রভাব কখনও কখনও এই চ্যালেঞ্জকে জটিল করে তোলে।” তিনি সতর্ক করে দেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিশ্বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ক্রিস ব্রডের বিস্ফোরক মন্তব্য শুধু ভারতীয় দলের মাঠের কার্যক্রমের সমালোচনা নয়, বরং আইসিসির অভ্যন্তরীণ নীতিগত ত্রুটি এবং রাজনৈতিক প্রভাবেরও ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্বচ্ছতা, ন্যায় এবং সততার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করতে তার বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্রডের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আইসিসির প্রভাবশালী দেশগুলোর বৈষম্যমূলক সুবিধা গ্রহণ এবং নিয়মের অসঙ্গত ব্যবহার নিয়ে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করবে। বিশেষ করে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রভাব এবং মাঠের বাইরে রাজনৈতিক চাপের কারণে নিয়মের যথাযথ প্রয়োগে বাধা আসতে পারে এমন অভিযোগ ক্রিকেটভিত্তিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসবে।
এদিকে, ক্রিকেটপ্রেমীরা ব্রডের বক্তব্যকে আইসিসির অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা বৃদ্ধির একটি আহ্বান হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোন দেশের প্রতি অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হলে তা খেলাধুলার ন্যায্যতা ও দর্শক আস্থা ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
ক্রিস ব্রডের এই বিস্ফোরক মন্তব্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দিচ্ছে যে, মাঠের বাইরে রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রভাবশালী দেশের চাপ কখনও কখনও নিয়মের সঠিক প্রয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে, এবং এ ধরনের ঘটনা খেলাধুলার নৈতিকতা ও সততার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।