প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনের জন্য গঠিত হলো পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন। এই কমিশনই তদারকি করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত হবে তাদের প্রতিনিধিরা।
বুধবার (২৯ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. শেখ গিয়াস উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে কমিশন গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ ও হল শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন ২০২৫ পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ ও হল শিক্ষার্থী সংসদসমূহের গঠন ও পরিচালনা বিধিমালা ২০২৫ এর ১৫(১) ধারার আলোকে সিন্ডিকেটের অনুমোদনক্রমে এই কমিশন গঠন করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে কমিশনের চার সদস্য হিসেবে রয়েছেন আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কানিজ ফাতেমা কাকলি, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জুলফিকার মাহমুদ এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনিসুর রহমান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, কমিশন গঠনের মাধ্যমে এখন শুরু হবে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি। ভোটার তালিকা প্রণয়ন, মনোনয়নপত্র দাখিল, প্রার্থী যাচাই-বাছাই, প্রচারণার বিধিনিষেধ এবং ভোটগ্রহণের পদ্ধতি—সব কিছু নির্ধারণ করবে নবগঠিত কমিশন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়েছে প্রশাসন, যদিও আনুষ্ঠানিক তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ, যেখানে শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিকভাবে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে। আমরা চাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক, যাতে সকল শিক্ষার্থী তাদের মত প্রকাশের সুযোগ পান।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে জকসু নির্বাচনের গুরুত্ব আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি কার্যকর শিক্ষার্থী সংসদের দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও সাংগঠনিক অনিশ্চয়তার কারণে এতদিন নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ও শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে এবার বাস্তবায়নের পথে এগোলো সেই প্রত্যাশা।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে কমিশন গঠনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসজুড়ে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন, এটি জবির ছাত্ররাজনীতিতে একটি নতুন সূচনা। বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতিতে স্বচ্ছতা, নেতৃত্বের বিকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ সৃষ্টিতে এই নির্বাচনকে তারা আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা চাই এই নির্বাচন হোক দলীয় প্রভাবমুক্ত, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন ঘটুক। বহু বছর পর আমরা ভোট দিতে যাচ্ছি, এটাই বড় আনন্দের।”
তবে শিক্ষকদের একাংশের মতে, কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান পুরান ঢাকার কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় বহিরাগত প্রভাব, প্রার্থীদের প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নিরপেক্ষতার মানদণ্ড বজায় রাখাও কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দা শাহনাজ আকতার বলেন, “আমরা শুরু থেকেই চাইছিলাম শিক্ষার্থীদের ভোটের মাধ্যমে তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। কমিশন গঠনের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া এখন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে যাতে নির্বাচন সম্পূর্ণ সুষ্ঠু হয়।”
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও নিজেদের প্রস্তুতি শুরু করেছে। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। যদিও আনুষ্ঠানিক প্রচারণা এখনো নিষিদ্ধ, তবুও সামাজিক মাধ্যমে প্রার্থিতা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাচনে ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন নিয়মিত শিক্ষার্থীরা। এছাড়া প্রার্থিতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু নীতিমালা থাকবে—যেমন একাডেমিক ফলাফল, শৃঙ্খলা রক্ষা, এবং ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের রেকর্ড বিবেচনা করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারা মনে করেন, যদি নির্বাচন সত্যিকারের স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে এটি ভবিষ্যতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও উদাহরণ হতে পারে।
এখন দৃষ্টি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। কমিশনের সামনে যেমন রয়েছে প্রত্যাশা, তেমনি রয়েছে দায়িত্বের ভার। সময়ই বলে দেবে, তারা কতটা সফলভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কিন্তু আপাতত বলা যায়, বহু বছরের নীরব ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা মুখিয়ে আছে।










