প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খুলনায় দীর্ঘ ১৪ বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে নবনির্মিত জেলা কারাগারের দ্বার খুলতে যাচ্ছে। আগামী শনিবার (১ নভেম্বর) সাজাপ্রাপ্ত ১০০ জন বন্দিকে স্থানান্তর করে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হবে। যদিও নতুন কারাগারটি আধুনিক ও সম্পূর্ণ সক্ষমতার সঙ্গে প্রস্তুত, জনবল সংকটের কারণে আপাতত এটি অর্ধেক সক্ষমতায় চালু হবে। কারাগারের পুরো সক্ষমতা অনুযায়ী বন্দির সংখ্যা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে।
২০১১ সালে খুলনার সিটি (রূপসা সেতু) বাইপাস সড়কের পাশে প্রায় ৩০ একর জায়গায় শুরু হয় নতুন জেলা কারাগারের নির্মাণ কাজ। সময়সীমা ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পটি ৮ বার সময়সীমা সম্প্রসারণ করেছে এবং ব্যয় দুই দফায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট ২৮৮ কোটি টাকার ব্যয়ে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও কারা কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাশিত আধুনিক সংশোধনাগার পেয়েছে।
সদ্যসম্পন্ন সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, কারাগারের ভিতরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মাটি সমানকরণ, সৌন্দর্যবর্ধন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। কারারক্ষীরা প্রশাসনিক ভবন, ফটক এবং বিভিন্ন স্থাপনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। খুলনা কারাগারের জেলার মোহাম্মদ মুনীর হুসাইন জানান, প্রথম পর্যায়ে সীমিত বন্দি নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং পূর্ণ সক্ষমতায় কারাগার চালু হবে।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার দুটি কারাগার পরিচালনার জন্য মোট ৬০০ জন জনবল প্রয়োজন, যেখানে বর্তমানে রয়েছে মাত্র ২০৮ জন। সম্প্রতি নতুন করে ৪৪ জন জনবল পদায়ন করা হয়েছে। তাই বর্তমান সময়ে নতুন ও পুরনো কারাগার দুইয়েরই কার্যক্রম সীমিত সক্ষমতায় পরিচালনা করা হবে। সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, পুরনো কারাগারে খুলনা মহানগরের বন্দিদের রাখা হবে, আর নতুন কারাগারে জেলা সংলগ্ন নয়টি উপজেলার বন্দিদের রাখা হবে।
নতুন কারাগারটি আধুনিক সংশোধনাগার হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে বিচারাধীন ও সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য পৃথক ভবন রয়েছে। কিশোর ও কিশোরীদের জন্য আলাদা ব্যারাক এবং নারীদের জন্য পৃথক হাসপাতাল ও মোটিভেশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। বন্দিদের চিকিৎসার জন্য ৫০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে। কারারক্ষীদের সন্তানদের জন্য স্কুল, লাইব্রেরি, ডাইনিং, আধুনিক সেলুন ও লন্ড্রি সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিশু ও নারীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড ও ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে, যেখানে সাধারণ বন্দিদের প্রবেশাধিকার থাকবে না।
কারাগারের অবকাঠামোতে রঙিন ভবন, টাইলসের ফুটপাত, পাকা রাস্তা, ড্রেন, ওয়াকওয়ে, সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। বন্দিদের প্রতিটি ব্যারাকের চারপাশে পৃথক সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে এক শ্রেণির বন্দি অন্য শ্রেণির সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে পুরো কারাগারের ভেতরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে।
খুলনা গণপূর্ত বিভাগ–২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান জানান, মোট ৫৭টি স্থাপনা নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যে বন্দিদের থাকার ভবন ১১টি। সকল স্থাপনা এখন কারা কর্তৃপক্ষের হস্তান্তর করা হয়েছে। মাস্টারপ্লান অনুযায়ী, নতুন কারাগারে সর্বমোট ৪ হাজার বন্দি রাখার ক্ষমতা থাকবে। আপাতত নির্মিত অবকাঠামোতে ২ হাজার বন্দির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পৃথক প্রকল্পের মাধ্যমে আরও স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ রয়েছে।
নতুন কারাগারের উদ্বোধন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান চালুর ঘটনা নয়, এটি খুলনায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মানবিক ও আধুনিক সংশোধনাগারের সূচনা। এখানে বন্দিদের শাস্তি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন, পুনর্বাসন ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। কারাগারের প্রতিটি স্থাপনা বন্দির মানবিক চাহিদা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাগত ও সংস্কৃতিক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নতুন কারাগারের খোলার মাধ্যমে খুলনার নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বন্দিদের পুনর্বাসন এবং সমাজে তাদের মানসম্মত প্রত্যাবর্তনের জন্য কার্যক্রমকে আরও সুনিশ্চিত করা যাবে। কারারক্ষীদেরও সুবিধা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যাতে তারা তাদের পরিবারের সঙ্গে সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশে থাকতে পারে।
নবনির্মিত এই কারাগারের উদ্বোধন খুলনার জন্য একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করবে। এটি শুধু শাস্তি দেওয়ার স্থান নয়, বরং এটি একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠান যেখানে পুনর্বাসন ও সংশোধন ব্যবস্থার সঙ্গে মানবিক ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় থাকবে। বন্দিরা সুষ্ঠু নিরাপত্তা এবং পর্যবেক্ষণসহ জীবন কাটাতে পারবে, যা তাদের মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসনে সহায়ক হবে।
এভাবেই খুলনায় ১৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর শুরু হচ্ছে নতুন যুগের কারাগার। যেখানে শাস্তি এবং মানবিক পুনর্বাসন একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কারাগারের সম্পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা হলে এটি খুলনার বৃহত্তম ও আধুনিকতম সংশোধনাগারে পরিণত হবে।