প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিলিস্তিনি এক বন্দিকে নির্যাতনের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক বিতর্কের মুখে পদত্যাগ করেছেন ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রধান আইনি কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ইফাত টোমার-ইয়েরুশালমি। শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) তিনি তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এই ঘটনার মাধ্যমে ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিনের গোপন অসঙ্গতি আবারও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় এসেছে।
গত আগস্টে ওই ভিডিও প্রকাশের অনুমতি দিয়েছিলেন বলেই স্বীকার করেছেন টোমার-ইয়েরুশালমি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ইসরাইলি সেনারা এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে একটি ঘরে নিয়ে যায় এবং সেখানে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ভিডিওটি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। এ ঘটনায় ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ডানপন্থি রাজনীতিকরা সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলার তীব্র সমালোচনা করেন, তারা এটিকে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা বলে দাবি করেন।
তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য যখন সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন, তখন বিক্ষুব্ধ ডানপন্থি বিক্ষোভকারীরা দুটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এতে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অস্থির হয়ে ওঠে।
ইসরাইলের এন১২ নিউজে ফাঁস হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বন্দিকে কয়েকজন সৈন্য টেনে-হিঁচড়ে একটি কক্ষের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের চারপাশে অস্ত্রধারী সৈন্যদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কক্ষে প্রবেশের পর ওই বন্দির প্রতি কী ধরনের আচরণ করা হয়, তা দৃশ্যমান না হলেও তার আর্তনাদ ও চিৎকারের শব্দ রেকর্ডে ধরা পড়ে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলিও ইসরাইলের সেনা বাহিনীর আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানায়।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, “ভিডিও ফাঁসের ঘটনা একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা টোমার-ইয়েরুশালমিকে জোরপূর্বক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।”
কিন্তু মাত্র দুই দিন পরই, টোমার-ইয়েরুশালমি নিজেই পদত্যাগপত্র জমা দেন। তিনি তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন, “আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো আইনবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নিইনি। আমি কেবল সেনাবাহিনীর আইনি বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা করেছি। কিন্তু যুদ্ধকালীন সময়ে এই বিভাগটি নানা ভিত্তিহীন অপপ্রচার ও রাজনৈতিক চাপের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।”
তিনি আরও লেখেন, “একজন আইনি কর্মকর্তা হিসেবে আমি সবসময় ন্যায়ের পক্ষে ছিলাম। কিন্তু যখন সত্য ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন পদত্যাগই একমাত্র পথ।”
ইসরাইলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, টোমার-ইয়েরুশালমির পদত্যাগ ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ভেতরে গভীর বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মানবাধিকার ইস্যুতে দেশটির সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার মুখে। গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের চলমান অভিযানে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনায়ও আন্তর্জাতিক মহল ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রনেন সেগেভ বলেন, “টোমার-ইয়েরুশালমির পদত্যাগ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি এক গভীর সংকেত— যে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে নৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকট হচ্ছে। এই পদত্যাগ ইসরাইলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলবে।”
অন্যদিকে, ডানপন্থি রাজনীতিকরা তার পদত্যাগকে “চাপের কাছে নতি স্বীকার” বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইসরাইলি পার্লামেন্টের এক সদস্য বলেছেন, “আমাদের সৈন্যদের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই পদত্যাগ প্রমাণ করে, সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব রাজনীতির প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।”
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অবশ্য কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে দেশটির অভ্যন্তরে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা সরকারকে নতুন করে চাপে ফেলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টোমার-ইয়েরুশালমির পদত্যাগের পর সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং মানবাধিকার রক্ষায় নতুন করে তদারকির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে এখন ইসরাইলের ভাবমূর্তি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চাপে রয়েছে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে “ন্যায়ের বিজয়” হিসেবে দেখছে। ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “ইসরাইলের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এমন পদত্যাগ প্রমাণ করে, তাদেরই কিছু কর্মকর্তার মধ্যে বিবেক এখনো জীবিত আছে। এই নির্যাতনের ভিডিও কেবল একটি উদাহরণ, বাস্তবে এরকম হাজারো ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন।”
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি বন্দি যাকে নির্যাতন করা হয়েছিল, তিনি বর্তমানে গুরুতর শারীরিক আঘাত নিয়ে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বন্দির শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম ও ভাঙা হাড়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘বেতসেলেম’-এর পরিচালক সারাহ লেভিন বলেন, “এই ভিডিওর ভয়াবহ দৃশ্যগুলো ইসরাইলি সেনাদের বাস্তব মুখোশ খুলে দিয়েছে। শুধু ওই বন্দি নয়, হাজারো ফিলিস্তিনি প্রতিদিন এমন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এখনও নীরব থাকে, তবে ভবিষ্যতে এই অপরাধ আরও ভয়াবহ আকার নেবে।”
ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমগুলোতে এ ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর গাজার বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর মাধ্যমে দোষীদের বিচারের দাবি জানায়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই পদত্যাগ শুধু ইসরাইলের সেনাবাহিনীর নয়, বরং দেশের নৈতিক সংকটের প্রতিফলন। যুদ্ধকালীন সময়ে মানবাধিকার ও ন্যায়ের প্রশ্নে ইসরাইল এখন এক অনিশ্চিত দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।
টোমার-ইয়েরুশালমির বিদায়ের পর নতুন আইনি প্রধান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এই পদে কে আসছেন তা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানিয়েছে, নতুন কর্মকর্তার নিয়োগে “রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্য” বিবেচনায় নেওয়া হবে।
ফিলিস্তিনি বন্দিকে নির্যাতনের ভিডিও যেমন ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক নির্মম প্রমাণ, তেমনি মেজর জেনারেল টোমার-ইয়েরুশালমির পদত্যাগ সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতরে থাকা নৈতিক সংঘাতের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। তার এই সরে দাঁড়ানো এখন ইসরাইলি সমাজে এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে— “যুদ্ধের নামে কতদূর যাওয়া যায়, আর কোথায় থামা উচিত।”