প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তর আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরীফের কাছাকাছি অঞ্চলে আবারও ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে পাহাড়ি জনপদ। স্থানীয় সময় রবিবার গভীর রাতে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং দেড় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৩, যা স্থানীয় সময় রাত ১২টা ৫৯ মিনিটে মাজার-ই-শরীফ শহর থেকে অল্প দূরে খোলম এলাকায় আঘাত হানে। আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে হাজারো মানুষ, অনেকেই রাত কাটায় খোলা আকাশের নিচে।
ভয়াবহ কম্পনের পর আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের সামানগান প্রদেশে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও মানবিক সংস্থাগুলো। তবে ভূমিকম্পের মাত্রা ও প্রভাব বিবেচনায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সামিম জোয়ান্দা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সোমবার সকাল পর্যন্ত পাওয়া হাসপাতালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় আহতের সংখ্যা ১৫০ ছাড়িয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা সাত। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে বহু ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামানগানের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগও আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে পড়েছে, যার ফলে উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার তাদের সদস্যদের খুঁজে পাচ্ছে না, আর হাসপাতালে ভিড় জমেছে আহতদের স্বজনদের। ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেকে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিসি) জানায়, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল মাজার-ই-শরীফ শহরের নিকটবর্তী খোলম এলাকা, যার গভীরতা ছিল ২৮ কিলোমিটার। ভূমিকম্পের সময় পুরো শহর জুড়ে কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী কম্পন অনুভূত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের নিস্তব্ধতায় হঠাৎ ভয়াবহ শব্দে কেঁপে ওঠে ঘরবাড়ি। শিশুরা কান্নায় ভেঙে পড়ে, মানুষ দৌড়ে বেরিয়ে আসে রাস্তায়।
এক প্রত্যক্ষদর্শী আল জাজিরাকে বলেন, “আমাদের মনে হচ্ছিল মাটি ফেটে যাবে। ঘর কাঁপতে শুরু করলে সবাই ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। কিছু মানুষ ফিরে গিয়ে নিজেদের সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে বের করে আনতে পারেনি। এখনো অনেকে নিখোঁজ।”
ভূমিকম্পের ফলে বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, যেসব এলাকায় সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে, সেখানে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
গত কয়েক মাস ধরেই আফগানিস্তান ভূমিকম্পপ্রবণ উত্তরের এলাকায় একের পর এক ভূমিকম্পের আঘাতে বিপর্যস্ত। এর আগে ৩১ আগস্ট দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হেনেছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প, যেখানে প্রাণ হারান দুই হাজার দুই শতাধিক মানুষ। হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধসে পড়ে এবং লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে।
ভূমিকম্পের এই ঘনঘটিত অবস্থার পেছনে আফগানিস্তানের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার ভূমিকম্পবিদ ব্রায়ান ব্যাপটি বলেন, “আফগানিস্তান এমন এক টেকটনিক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষ ঘটে। এর ফলে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প দেখা দেয়।” তিনি আরও জানান, ১৯০০ সালের পর থেকে উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানে ৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী কম্পন অন্তত ১২ বার আঘাত হেনেছে, যা দেশটির অবকাঠামো ও জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে সাহায্য কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। আফগান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানায়, ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য জরুরি মেডিকেল টিম কাজ করছে। জাতিসংঘের আফগানিস্তান কার্যালয় (ইউএনএএমএ) ভূমিকম্পে হতাহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তান এখনো রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটির মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। অনেক পরিবার এখনো গত আগস্টের ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি, সেখানে নতুন করে এই কম্পন তাদের জীবনে আবারও ভয় ও অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে।
সামানগানের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের জীবন এখন আতঙ্কের মধ্যে কাটছে। গতবার ঘর হারিয়েছিলাম, এবারও জানি না টিকে থাকতে পারবো কিনা। আল্লাহ যেন দয়া করেন।”
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এখনও আফটারশকের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে ইউএসজিসি। সরকার জনগণকে নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে এবং যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
আফগানিস্তানের এই ভূমিকম্প আবারও স্মরণ করিয়ে দিলো, দুর্যোগপ্রবণ এই দেশের মানুষের জীবন কতটা নড়বড়ে ও অনিশ্চিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রেক্ষাপটে বারবার প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেশটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলছে। তবুও, ভগ্নাবশেষের মধ্যেও বেঁচে থাকার আশায় মানুষ লড়ছে—ভয়, ক্ষতি আর প্রার্থনার মাঝেই তাদের দৈনন্দিন জীবন এগিয়ে চলছে।










