সিলেটে অসামাজিক কার্যকলাপ পুলিশি অভিযান একমাসে ৬ হোটেল সিলগালা, গ্রেপ্তার ৭২৫

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৭ বার
সিলেটে অসামাজিক কার্যকলাপ পুলিশি অভিযান একমাসে ৬ হোটেল সিলগালা, গ্রেপ্তার ৭২৫

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেটে সম্প্রতি অসামাজিক কার্যকলাপ ও অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযান আরও জোরদার হয়েছে। পুরো অক্টোবর মাস জুড়ে চালানো বিশেষ অভিযানে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) নগরজুড়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ৭২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পাশাপাশি অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে নগরের ছয়টি হোটেল সিলগালা করা হয়েছে। অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক, চোরাচালান পণ্য এবং আটক করা হয়েছে বেশ কয়েকজন অপরাধী, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকার প্রমাণ বহন করছে।

রবিবার (২ নভেম্বর) এসএমপির মিডিয়া উইং থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নগর পুলিশের অধীনে চলতি অক্টোবর মাসে মোট ৭২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছে ৫৬ জন চোর, ১৭ জন ছিনতাইকারী, ৬৩ জন মাদক ব্যবসায়ী এবং ১২২ জন জুয়াড়ি। এছাড়া অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন হোটেল থেকে আটক করা হয়েছে ১৯ জন নারী-পুরুষকে। নগরের বেশ কয়েকটি হোটেলে এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ সেগুলো সিলগালা করে দেয়।

এসএমপি জানিয়েছে, হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠছিল। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গোপন নজরদারি শেষে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে দেখা যায়, কিছু হোটেল কাগজে-কলমে আবাসিক ব্যবসা পরিচালনা করলেও বাস্তবে সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছিল অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়া হিসেবে। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে হোটেলগুলো সিলগালা করা হয়।

পুলিশ জানায়, অক্টোবর মাসে নগরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। এ সময় উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৭৩০ পিস ইয়াবা, ৪ কেজি ২২০ গ্রাম গাঁজা, ৭১৩ বোতল বিদেশি মদ, ১৪৫ লিটার চোলাই মদ এবং ২১ বোতল ফেন্সিডিল। মাদকদ্রব্যগুলো স্থানীয় বাজারে কয়েক লাখ টাকার সমপরিমাণ বলে ধারণা করছে পুলিশ। এছাড়া একমাসে ১ হাজার ৯৯১টি যানবাহন জব্দ করা হয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলো ছিল অনুমোদনবিহীন বা আইনবিরোধীভাবে পরিচালিত।

মাদক ও অপরাধ দমনের পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪ জন ভিকটিমকে, যারা বিভিন্ন অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন নিখোঁজ ব্যক্তিও ছিলেন বলে জানায় পুলিশ। উদ্ধারকৃতদের আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এছাড়া অক্টোবর মাসে নগরে পরিচালিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ৭,৯২০ কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ, ৩১ পিস কাতান শাড়ি, ৩,৭৪৩ পিস ভারতীয় চকলেট, ১,৪২৫ পিস মেন্টস রেনবো চকলেট, ৪,২০,০০০ শলাকা ভারতীয় নাসিরুদ্দিন বিড়ি এবং ৩৬৩ পিস সাবান। এছাড়া জব্দ করা হয়েছে ৬৪টি ভারতীয় কম্বল, ২,০৭১ পিস ভারতীয় শাড়ি, ৩১ প্যাকেট চকলেট, ১,৬০০ পিস স্কিন কেয়ার ক্রিম, ১,৬৮,০০০ শলাকা বিড়ি, ৭৭০ প্যাকেট বিদেশি সিগারেট, ৯,২১৪ কেজি ভারতীয় চা পাতা, ১,৪৪০ কেজি কেনু, ৫২ বস্তা জিরা এবং ২৬টি মোবাইল হ্যান্ডসেট।

এসএমপি সূত্রে জানা যায়, এসব চোরাচালান পণ্য সীমান্তবর্তী এলাকা হয়ে নগরে প্রবেশ করানো হচ্ছিল। তবে পুলিশের নিয়মিত অভিযান এবং তথ্যনির্ভর টহলের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে চোরাচালান কার্যক্রম অনেকটাই কমে এসেছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। মাদক, চোরাচালান ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। যারা এসব অপরাধে জড়িত, তারা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইনের আওতায় আনা হবে।”

নগরবাসীর একাংশ পুলিশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে সিলেটে অপরাধচক্রগুলো সাহসী হয়ে উঠেছিল। অনেক এলাকায় রাতের বেলা ছিনতাই, চুরি, মাদক বেচাকেনা এবং হোটেলে অসামাজিক কার্যকলাপ বেড়ে গিয়েছিল। অক্টোবর মাসের এই অভিযান সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।

তবে কিছু মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সংগঠনও বলছে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। কারণ শুধু গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের মূল কারণগুলো দূর করতে হবে—বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব, মাদকের সহজলভ্যতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের মতো বিষয়গুলো সমাধান করতে হবে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সিলেট মহানগরকে একটি নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে। স্থানীয় নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতা সভা আয়োজন এবং ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা নেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে এসএমপি।

অক্টোবর মাসের এই অভিযান সিলেট নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে বলে জানিয়েছেন নগরবাসী। তাদের মতে, এ ধরনের ধারাবাহিক অভিযান চলতে থাকলে মাদক, চোরাচালান ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে পুলিশের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিক সচেতনতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে তবেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।

পুলিশের বিজ্ঞপ্তির ভাষায়, “সিলেটকে একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত নগরে রূপ দিতে আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাদক, চোরাচালান বা অসামাজিক কার্যকলাপ—যে কোনো অপরাধেই আইন তার নিজস্ব গতিতে কাজ করবে।”

অর্থাৎ, অক্টোবর মাসের এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়—এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ববোধ, নাগরিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের একটি বাস্তব চিত্র। সিলেট এখন দেখছে পরিবর্তনের আভাস, যেখানে অপরাধের জায়গায় ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ক্রমশ জোরদার হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত