প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বে পরমাণু শক্তি সংক্রান্ত সংবেদনশীল পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া, ইরান ও চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকটি আসন্ন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নর্সের সভার আগে আয়োজিত হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিনিধি মিখাইল উলিয়ানভ জানান, বৈঠকে তিন দেশের প্রতিনিধি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সংশ্লিষ্ট ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং নিজেদের অবস্থান সমন্বয় করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, বৈঠকে পরস্পরের মতামত বিনিময় করা হয়েছে এবং ১৯ থেকে ২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য আইএইএ বোর্ড সভাকে সামনে রেখে বিভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও মতামত চূড়ান্ত করা হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিনিধি উলিয়ানভ টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে জানান, ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে আমাদের ত্রিপক্ষীয় আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বৈঠকে আমরা পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পদক্ষেপ সমন্বয় করেছি, যাতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিষয়গুলোকে আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা যায়। তিনি বলেন, “ত্রিপক্ষীয় এই বৈঠক আমাদের কৌশলগত সমন্বয়কে আরও দৃঢ় করেছে। আমরা আশা করি, আইএইএ বোর্ড সভায় আমাদের অবস্থান কার্যকরভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।”
অপরদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বৈঠক ও ত্রিপক্ষীয় আলোচনা নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তেহরান পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে কোনো আলোচনায় যুক্ত হবেনা ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা হবে না। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু বৈঠকে কোনোভাবে আলোচনার বিষয় নয়। আরাগচি বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগের আলোচনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছে। তবে ইরানের অবস্থান সবসময় স্পষ্ট, এ ধরনের আলোচনায় আমরা অংশ নেব না।”
তিনি আরও জানান, ইরান ও ওমানের মধ্যে গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় সংলাপ চালু রয়েছে। এই বৈঠকগুলো প্রতি ছয় মাস অন্তর অনুষ্ঠিত হয় এবং উভয় দেশের মধ্যে স্থিতিশীলতা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে নেয়া হয়। আরাগচি বলেন, “তেহরান ও মাসকাটের মধ্যে এই নিয়মিত পরামর্শ বৈঠকগুলোর মাধ্যমে আমরা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
বৈঠকে পরমাণু কর্মসূচি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত সমন্বয়, কৌশলগত পদক্ষেপ, এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে রাশিয়া এবং চীনের সমর্থন ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে এই বৈঠকটি আইএইএ বোর্ড সভার আগে সমন্বয় রক্ষার উদ্দেশ্যেই অনুষ্ঠিত হয়, যাতে আন্তর্জাতিক পরমাণু নীতি ও নীতি নির্ধারণে ত্রিপক্ষীয় অবস্থান সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়।
এছাড়া, বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিনিধি দেশের কৌশলগত স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং আইনসম্মত কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে সমন্বয় করে। ত্রিপক্ষীয় এই আলোচনা আন্তর্জাতিক পরমাণু বিষয়ক মঞ্চে তাদের অবস্থানকে আরও দৃঢ় ও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চলমান বৈঠক ও আলোচনার মধ্যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক বিবেচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া, চীন এবং ইরান ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কমিউনিটিকে বোঝাতে চায় যে, তারা একটি সমন্বিত এবং স্থির নীতি অনুসরণ করছে এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বৈঠক আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি পরমাণু বিষয়ক আন্তর্জাতিক নীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় রক্ষা এবং আইএইএ বোর্ড সভার আগে প্রস্তুতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বৈঠকের মাধ্যমে দেশগুলো পারস্পরিক সমন্বয় ও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিজেদের জাতীয় স্বার্থও রক্ষা করতে চাইছে।
ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ও প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক পরমাণু নীতিতে সামঞ্জস্যতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন।
সুতরাং, চীন, রাশিয়া ও ইরানের এই বৈঠক শুধু ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়ের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরমাণু কর্মসূচি, নিরাপত্তা এবং নীতি নির্ধারণে তাদের অবস্থানকে সুস্পষ্ট করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।