ট্রাম্পের স্বীকারোক্তি: ইরানের হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলাম আমি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার
ট্রাম্পের স্বীকারোক্তি: “ইরানের হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলাম আমি”

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, চলতি বছরের জুন মাসে ইরানে ইসরাইলের হামলায় তিনি নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছিল যে, ইসরাইল এককভাবে ওই হামলা চালিয়েছিল। ট্রাম্পের এই নতুন মন্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

ওই দিন হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “ইসরাইল প্রথমে ইরানে হামলা চালায়। সেটা ছিল খুব শক্তিশালী আঘাত। আমি সেই হামলার নেতৃত্বে ছিলাম।” তিনি আরও যোগ করেন, “ইরানে ওই হামলাটি ছিল ইসরাইলের জন্য বিশেষ একটি দিন। কারণ ওই হামলাতেই ইরানের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে।”

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প কার্যত স্বীকার করলেন, যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই ইসরাইলের সামরিক অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। অথচ যুদ্ধের শুরুর দিকে ওয়াশিংটন জোর দিয়েছিল যে ইসরাইল একাই এই অভিযান পরিচালনা করেছে।

ইরানে ভয়াবহ হামলা: ১৩ জুনের ঘটনা

২০২৫ সালের ১৩ জুন ভোররাতে ইসরাইল ইরানের উপর আকস্মিক আক্রমণ চালায়। কোনো পূর্বাভাস বা উসকানি ছাড়াই শুরু হওয়া এই হামলায় ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা এবং বেসামরিক এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। নিহত হন ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ জেনারেল, পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও শতাধিক সাধারণ মানুষ। ইরানও সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরাইলের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

তখনই ধারণা করা হয়েছিল, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন ভূমিকা থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তখন বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। বলা হয়, ইসরাইল স্বাধীনভাবে এই অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু পাঁচ মাস পর ট্রাম্পের মুখে এমন স্বীকারোক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বের বক্তব্যকে সম্পূর্ণ প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন

ইরান-ইসরাইল সংঘাতের সময় থেকেই নানা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দাবি করে আসছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। হামলার ধরন, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানো হয়, যা ইসরাইলের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ওই সময় ইসরাইলের সঙ্গে যৌথ সামরিক কৌশলে কাজ করেছে। সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সাইবার সমর্থন এবং বিমান প্রতিরক্ষা সমন্বয়—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই সন্দেহ এখন নিশ্চিত রূপ পেয়েছে।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য?

ট্রাম্পের এই স্বীকারোক্তি অনেকেই রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনের আগে তিনি হয়তো নিজের “দৃঢ় নেতৃত্ব” প্রদর্শনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। ইসরাইলের প্রতি ট্রাম্পের অটল সমর্থন এবং ইরানবিরোধী অবস্থান সব সময়ই তাঁর নীতির অংশ ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি হয়তো নিজের ভূমিকা জোরালোভাবে তুলে ধরছেন, যাতে তাঁর সমর্থকগোষ্ঠী সন্তুষ্ট থাকে।

তবে এই বক্তব্য কূটনৈতিকভাবে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনও পর্যন্ত ট্রাম্পের মন্তব্যের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইরান ট্রাম্পের বক্তব্যকে “যুদ্ধাপরাধের স্বীকারোক্তি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালতে এই ঘটনার বিচার দাবি করা হবে। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইসরাইলের মাধ্যমে একতরফা আগ্রাসন চালিয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামো ধ্বংস করা।

জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র ট্রাম্পের মন্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই স্বীকারোক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, পুরো পশ্চিমা জোটের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে। এর ফলে ইরান আন্তর্জাতিক সহানুভূতি অর্জন করতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন জোটবদ্ধতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

মানবিক বিপর্যয় ও যুদ্ধের পরিণতি

ইরানে ওই হামলার ফলে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। হাসপাতাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই হামলাকে “অমানবিক ও অনৈতিক” বলে আখ্যা দিয়েছে। অনেক সংস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উভয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত দাবি করছে।

অন্যদিকে ইসরাইল দাবি করছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ছিল “আঞ্চলিক শান্তির জন্য হুমকি”, তাই আত্মরক্ষার স্বার্থে এই হামলা চালানো হয়।

বৈশ্বিক প্রভাব ও দক্ষিণ এশিয়ার উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। তেলের বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোসহ সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশসহ তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে পারে। তাই আঞ্চলিক শান্তি ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

উপসংহার

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই স্বীকারোক্তি শুধু এক যুদ্ধের পেছনের গোপন ইতিহাসই প্রকাশ করেনি, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্তর্নিহিত দ্বিচারিতাকেও উন্মোচন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এতদিন যে “নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক” হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করছিল, তা আসলে ছিল এক সুপরিকল্পিত সামরিক জোটের অংশ।

এখন প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ব রাজনীতিতে এই স্বীকারোক্তির প্রভাব কতটা গভীর হবে? ইরান কি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করবে? যুক্তরাষ্ট্র কি নিজেকে দায়মুক্ত প্রমাণ করতে পারবে?

ট্রাম্পের কথায় হয়তো তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত হয়েছে, কিন্তু বিশ্বের শান্তি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যেমন বলা হয়—যুদ্ধ শুরু হয় একদিন, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি শোনা যায় যুগের পর যুগ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত