শহর খালি হতে পারে তেহরানে, সংকট গভীর হচ্ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৬ বার
তেহরানের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হতে পারে: পেজেশকিয়ান

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের রাজধানী তেহরান এই মুহূর্তে এক ভয়াবহ পানির সংকটের মুখোমুখি। সরকারী সূত্রে জানানো হয়েছে, যদি শিগগিরই বৃষ্টি না হয়, তবে শহরের বাসিন্দাদের স্থানান্তরের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সীমিত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে তেহরানের পানি সরবরাহ সীমিত করা ছাড়া উপায় থাকবে না এবং চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে শহর খালি করতে বাধ্য হতে হবে।

পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার ইরানের সানন্দজ সফরকালে এ বিষয়ে বলেন, ইরান বর্তমানে একাধিক সংকটের সম্মুখীন। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো একই সঙ্গে দেশকে প্রভাবিত করছে। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মূলত অভ্যন্তরীণ নীতিগত ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফল। সরকার এসব সংকট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছে, কিন্তু সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে অনেক প্রকল্প এখনও অসম্পূর্ণ রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইরান ভয়াবহ প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং বৃষ্টিপাতের ধারাবাহিক অভাব দেশটির পানি সংরক্ষণের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। তেহরানের পানি সরবরাহ মূলত পাঁচটি প্রধান বাঁধের ওপর নির্ভরশীল – লার, মামলু, আমির কবির, তালেকান এবং লাতিয়ান। এর মধ্যে আমির কবির বাঁধটি সবচেয়ে বড়। তবে, গত পাঁচ বছরে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি বছরও তেহরানের বৃষ্টিপাত মৌসুমী গড়ের প্রায় ৪০ শতাংশ কম হয়েছে, যা শহরের পানি সরবরাহের জন্য আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, “যদি আগামী মাসে বৃষ্টি না হয়, আমরা শহরে পানি সরবরাহ সীমিত করতে বাধ্য হব। আর যদি খরা অব্যাহত থাকে, তেহরান শহর ফাঁকা করার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।” তিনি শহরের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেন এবং পানি ও জ্বালানি সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষণের ওপর জোর দেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তেহরানের জলসংকট শুধুই আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি সমগ্র ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য গুরুতর মানবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শহরের কয়েক মিলিয়ন মানুষ দৈনন্দিন জীবনের জন্য পানি নির্ভর করছে, যা একাধিক শিল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালেও ব্যবহার হয়। পানি সংকট বাড়লে শুধুমাত্র নাগরিক জীবন বিপন্ন হবে না, বরং খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে।

মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। শহরের মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে পানি সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, খরা এবং অতিবৃক্ষতা প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে, তবে সীমিত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রকল্পগুলোকে ব্যর্থতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

তেহরানের পানি সংকট কেবল শহরের অন্তর্গত নয়; এটি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। রাজধানীর পানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত বাঁধগুলো অন্য জেলার নদী ও জলাধার থেকেও সরবরাহ নির্ভরশীল। তাই বৃষ্টিপাতের অভাব শুধুমাত্র তেহরানকে নয়, পুরো অঞ্চলের জল-ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে শহরের জীবনযাত্রা চরমভাবে বিপন্ন হতে পারে।

এই সংকটকে কেন্দ্র করে ইরানি প্রশাসন ইতিমধ্যেই কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জল সংরক্ষণ ও ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনা, ব্যাকআপ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, শুধুমাত্র প্রশাসনিক উদ্যোগে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিজ্ঞানী, পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তেহরানবাসীকে জলসঙ্কটের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে।

পানির মতো মৌলিক সম্পদ সীমিত হলে তা মানব জীবনের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তেহরানের জনগণ ইতিমধ্যেই এই বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছে। পেজেশকিয়ানের সতর্কবার্তা মানুষের জন্য একটি বার্তা হিসেবে এসেছে যে, শুধুমাত্র প্রশাসনের উদ্যোগ নয়, নাগরিকও সচেতন হতে হবে। পানি বাঁচানো, ব্যবহার কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এখন অত্যন্ত জরুরি।

তেহরানবাসীর জীবনের ওপর এই সংকটের প্রভাব মানবিক ও সামাজিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে শুধুমাত্র পানি সরবরাহ নয়, পুরো শহরের সামাজিক কাঠামোও বিপন্ন হতে পারে। ইরানি প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারি যে, শহর খালি করা পর্যন্ত পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, তা পুরো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের পরিস্থিতি শুধু স্থানীয় নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণায়ন ও খরার প্রকোপ বড় শহরের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তেহরান এই সংকটের মধ্যে দিয়ে এক বার্তা দিচ্ছে যে, জল-সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সচেতনতা ছাড়া কোনো শহর দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে না।

তেহরানবাসী এখন এক অদৃশ্য শূন্যতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জলহীনতা শুধু দৈনন্দিন জীবনের প্রভাব ফেলবে না, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। পানি সংরক্ষণে সচেতন নাগরিক ও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছাড়া তেহরানের এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়। পেজেশকিয়ানের সতর্কবার্তা মানবিক দিক থেকে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রতিধ্বনি তৈরি করেছে।

তেহরান শহরের ভবিষ্যৎ এখন বৃষ্টির ওপর নির্ভর করছে। শহরের মানুষ, প্রশাসন ও বিজ্ঞানীরা একযোগে কাজ না করলে, শিগগিরই তাদের বাস্তবতা হবে – পানি সংকটই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এবং জীবনযাত্রাকে মানিয়ে চলা একমাত্র বিকল্প হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত