যুক্তরাষ্ট্রে হাজারো ফ্লাইট বাতিল, স্থবির আকাশপথে আতঙ্ক ও ক্ষোভ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩০ বার
যুক্তরাষ্ট্রে হাজারো ফ্লাইট বাতিল, স্থবির আকাশপথে আতঙ্ক ও ক্ষোভ

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথে নেমে এসেছে এক অচলাবস্থার ছায়া। শুক্রবার দিনভর দেশটির ৪০টিরও বেশি প্রধান বিমানবন্দরে পাঁচ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়েছে। ফেডারেল সরকারের চলমান শাটডাউনের প্রভাব এখন তীব্র আকারে ছড়িয়ে পড়েছে বিমান চলাচলে, যা সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও পর্যটক—সব শ্রেণির মানুষকেই চরম দুর্ভোগে ফেলেছে। খবর বিবিসি, সিএনএন ও দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের।

সরকারি বাজেট অচলাবস্থার কারণে মার্কিন প্রশাসনের একাধিক দপ্তর কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)-এর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাজার হাজার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এবং নিরাপত্তা কর্মী বেতন ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ছুটি নিতে বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে ফ্লাইট ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, যা দেশজুড়ে যাত্রীদের মধ্যে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

এফএএ শুক্রবার এক জরুরি নির্দেশনায় জানায়, কর্মী সংকটের কারণে দেশব্যাপী ফ্লাইট ৪ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। পরিবহনমন্ত্রী সিন ডেফি জানান, “আমরা এক নজিরবিহীন সঙ্কটের মুখোমুখি। প্রতিদিন ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা বাড়ছে, কারণ পর্যাপ্ত জনবল ছাড়াই এত বড় আকাশপথ পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো ও ওয়াশিংটন ডিসি। এই শহরগুলোর বিমানবন্দরে হাজার হাজার যাত্রী আটকে পড়েছেন। কেউ কেউ রাত কাটাচ্ছেন টার্মিনাল ভবনের মেঝেতে, আবার কেউবা আশ্রয় নিয়েছেন নিকটবর্তী হোটেলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, কেউবা বিমর্ষ মুখে অপেক্ষা করছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে।

ভার্জিনিয়ার রোনাল্ড রিগ্যান ওয়াশিংটন ন্যাশনাল এয়ারপোর্টে গড়ে চার ঘণ্টা পর্যন্ত ফ্লাইট বিলম্ব হচ্ছে। অ্যারিজোনার ফিনিক্স স্কাই হারবার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গড়ে দেড় ঘণ্টা এবং শিকাগো, হিউস্টন ও অস্টিনের মতো শহরগুলোর বিমানবন্দরে এক ঘণ্টার বেশি বিলম্ব হচ্ছে। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিমান সংস্থাগুলোর সময়সূচি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে।

আমেরিকান, সাউথওয়েস্ট ও ডেলটা এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, যাত্রীদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে তারা অর্থ ফেরত বা বিনামূল্যে ফ্লাইট পরিবর্তনের সুযোগ দিচ্ছে। তবে বাস্তবে যাত্রীদের অভিযোগ, এই বিকল্প সুবিধাগুলো যথেষ্ট নয়। অনেকেই বলছেন, বাতিল ফ্লাইটের কারণে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সভা, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা চিকিৎসা সংক্রান্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট হারিয়েছেন।

শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বেতন ছাড়া কাজ করতে হচ্ছে বহু সরকারি কর্মীকে। এতে অনেকের মানসিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় চাকরিতে যোগ দিয়েছেন কিংবা বিকল্প উপার্জনের পথ খুঁজছেন। এফএএ-র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা প্রতিদিন যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করি, কিন্তু এখন আমাদের নিজেদের জীবনই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।”

ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা এই সংকটের মূলে। কংগ্রেসে বাজেট পাস না হওয়ায় সরকারি দপ্তরগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু বিমান চলাচল নয়, পুরো পরিবহন খাতেই বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। দেশজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিকাগোর ও’হেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক যাত্রী, লিসা মরগান, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমার মায়ের অসুস্থতার কারণে আমাকে জরুরি ভিত্তিতে নিউইয়র্ক যেতে হতো, কিন্তু ফ্লাইটটি তিনবার পিছিয়ে এখন বাতিল হয়ে গেছে। আমি জানি না আর কবে যেতে পারব। এটা শুধু একটা প্রশাসনিক জটিলতা নয়, এটা হাজারো মানুষের জীবনের প্রশ্ন।”

এদিকে, ফ্লাইট বাতিলের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ওপরও। ইউরোপ ও এশিয়া থেকে আগত ফ্লাইটগুলোর যাত্রীরা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে সংযোগ ফ্লাইট না পেয়ে আটকা পড়ছেন। নিউইয়র্কের জন এফ. কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাতভর শত শত যাত্রী অপেক্ষা করেছেন তাদের পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার জন্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান পরিবহন খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, যাত্রীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতেও সময় লাগবে।

ফেডারেল সরকারের শাটডাউন কবে শেষ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু যতদিন এই অচলাবস্থা চলবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথে অস্বস্তি ও উদ্বেগের ছায়া ঘন হতে থাকবে। প্রতিদিন নতুন নতুন যাত্রী এই দুর্ভোগে পড়ছেন, আর দেশজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই প্রশ্ন—একটি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশেও কি এমন বিশৃঙ্খলা সম্ভব?

পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে আগামী সপ্তাহে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ এখন কেবল মেঘে নয়, অনিশ্চয়তার ছায়াতেও ঢাকা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত