প্রকাশ : ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন উত্তেজনায় আবারও জ্বলে উঠেছে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো। রবিবার গভীর রাতে ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি রাশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহর বেলগোরোড ও ভোরোনেজে ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালায় কিয়েভের বাহিনী। এই হামলার ফলে দুই শহরেই বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং বহু এলাকায় তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে হাজারো মানুষ এখন অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছেন।
রাশিয়ার বেলগোরোড অঞ্চলের গভর্নর ভিয়াচেস্লাভ গ্ল্যাডকভ জানান, ড্রোন হামলায় শহরের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও তাপ সরবরাহের কেন্দ্রগুলো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে প্রায় ২০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎ ও গরম পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তিনি বলেন, “শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র বিস্ফোরণের পর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। আমাদের প্রকৌশল দল কাজ করছে, তবে ক্ষয়ক্ষতি এতটাই ব্যাপক যে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।”
একই সঙ্গে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের ভোরোনেজ শহরেও একাধিক ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। শহরের গভর্নর আলেক্সান্দার গুসেভ জানান, কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা বাহিনী ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও অন্তত একটি ড্রোন স্থানীয় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানে, ফলে সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
এই দুই শহরেই এখন বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ। অনেকে রাতের অন্ধকারে মোমবাতি জ্বালিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। শীতের এই সময়ে তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ায় বিশেষত বয়স্ক ও শিশুদের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ঠান্ডায় ঘর গরম রাখতে না পেরে তারা আশ্রয় নিচ্ছেন সরকারি ভবন ও আশ্রয়কেন্দ্রে।
রাশিয়ার জরুরি সেবা সংস্থা জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও গরম পানির সেবা দ্রুত পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত সাবস্টেশনগুলো পরীক্ষা করছেন এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে ব্যাপক ক্ষতির কারণে সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধারে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাশিয়ার অব্যাহত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব হিসেবেই এই ড্রোন অভিযান চালানো হয়েছে। কিয়েভের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, রাশিয়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে যেভাবে ধ্বংসাত্মক হামলা চালাচ্ছে, এই আক্রমণ সেই আগ্রাসনের পাল্টা জবাব। তাদের মতে, রাশিয়ার গভীরে আঘাত হেনে তারা মস্কোকে দেখাতে চাইছে—যুদ্ধের ভয়াবহতা শুধু ইউক্রেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ড্রোন হামলা ইউক্রেনের যুদ্ধকৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতদিন পর্যন্ত রুশ সীমান্তের অভ্যন্তরে ছোট আকারে আক্রমণ চালানো হলেও এবার তুলনামূলক বড় পরিসরে এই হামলা সংঘটিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ইউক্রেন বোঝাতে চাইছে যে, রাশিয়ার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলিও আর নিরাপদ নয়।
রাশিয়া অবশ্য দাবি করেছে, এই হামলাগুলোর বেশিরভাগই প্রতিহত করা হয়েছে এবং ড্রোনগুলোর একটি বড় অংশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা গুলি করে নামানো হয়েছে। তবুও যেসব ড্রোন লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়েছে, সেগুলো যে বড় ধরনের ক্ষতি ঘটিয়েছে, তা রুশ প্রশাসনের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার।
এই ঘটনার ফলে যুদ্ধের মানচিত্রে একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। এখন আর যুদ্ধ শুধু সীমান্তরেখায় সীমাবদ্ধ নয়—এটি ক্রমে সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের প্রাক্কালে এই ধরনের হামলা মানবিক সঙ্কটের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। শীতল আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ ও গরম পানির অভাব মানে হচ্ছে অসংখ্য মানুষের কষ্ট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি।
উভয় দেশই বর্তমানে শক্তি অবকাঠামোকে প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে, অন্যদিকে ইউক্রেন পাল্টা আঘাতে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে বিদ্যুৎ লাইন, তাপ কেন্দ্র, সাবস্টেশন—এসবই নতুন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বেলগোরোডে হাজারো পরিবার ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছে, স্কুল ও হাসপাতালগুলোর জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, অনেক হাসপাতালে জেনারেটর চালিয়ে চিকিৎসা সেবা চালিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু জ্বালানির ঘাটতির কারণে সেটিও দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়।
এদিকে রাশিয়া জানিয়েছে, তারা এই হামলার কঠোর প্রতিশোধ নেবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের এসব ড্রোন হামলা ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সমতুল্য’ এবং এর জবাব ‘অতিমাত্রায় কঠোর’ হবে।
আন্তর্জাতিক মহল এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুদ্ধের এই নতুন ধারা সাধারণ নাগরিকদের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও দুই দেশকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধের এই ধারাবাহিকতায় দেখা যাচ্ছে, রাশিয়া ও ইউক্রেন কেউই পিছু হটতে রাজি নয়। একদিকে রাশিয়া তাদের সীমান্তরক্ষায় কঠোর অবস্থানে, অন্যদিকে ইউক্রেন আত্মরক্ষার নামে পাল্টা আঘাত হানছে। কিন্তু এই সংঘাতের আসল মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ—যারা এখন ঠান্ডায়, অন্ধকারে, আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।
রবিবার রাতের ড্রোন হামলা তাই শুধু সামরিক নয়, এটি মানবিক বিপর্যয়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সীমান্তের আকাশে যখন গর্জে উঠছে ড্রোন, তখন মাটিতে বসে থাকা মানুষগুলো প্রার্থনা করছে—একটি আলো, একটি উষ্ণতা, একটি শান্তির ভোরের জন্য।