রাজধানীতে সকালে দুটি বাসে আগুন, আতঙ্কে যাত্রীরা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৫ বার
মানিকগঞ্জে স্কুলবাসে আগুন, দগ্ধ ঘুমন্ত চালক

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকায় সোমবার ভোরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে হঠাৎই দেখা দিল আগুনের লেলিহান শিখা। সকাল সাড়ে ছয়টার কিছু পরেই রাজধানীর দুই ভিন্ন প্রান্তে—বাড্ডা ও শাহজাদপুরে—দুটি যাত্রীবাহী বাসে একযোগে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে কোনো প্রাণহানি না হলেও শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক। আগুন নেভাতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রথম ঘটনাটি ঘটে বাড্ডার ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে। ‘আকাশ এন্টারপ্রাইজ’ নামে যাত্রীবাহী একটি বাস রাস্তার পাশে যাত্রী তোলার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎই কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি বাসটির পেছনের অংশে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যেই স্থান ত্যাগ করে। অগ্নিসংযোগের মুহূর্তে বাসটিতে কিছু যাত্রী ছিল, তবে চালক ও সহকারীর দ্রুত বুদ্ধিমত্তায় সবাই নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাসটির পেছনের অংশ পুরোপুরি পুড়ে যায়।

একই সময়ে, রাজধানীর অন্য প্রান্তে গুলশান থানার অন্তর্গত শাহজাদপুর বাঁশতলায় ঘটে আরেকটি একই ধরণের ঘটনা। স্থানীয়রা জানান, ‘ভিক্টর ক্লাসিক’ নামে আরেকটি বাস যখন স্টপেজে অপেক্ষমাণ ছিল, তখন কয়েকজন দুর্বৃত্ত দ্রুত এগিয়ে এসে গায়ে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা দমকল বাহিনীকে খবর দিলে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট দ্রুত উপস্থিত হয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

এমন আকস্মিক দুটি ঘটনার পর এলাকায় তৈরি হয় তীব্র আতঙ্ক। সকালে অফিসগামী যাত্রীদের ভিড়ে তখন বাড্ডা ও শাহজাদপুর সড়কে বাড়তে থাকে যানজট। পুলিশের উপস্থিতিতে বাস দুটি রাস্তার পাশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে আশপাশের এলাকায় আরও কিছুক্ষণ যান চলাচল স্বাভাবিক হতে সময় লাগে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, এটি পরিকল্পিত নাশকতার অংশ হতে পারে। তবে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। দায়ীদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।”

পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাবও ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু করেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি রাজধানীতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে বিভিন্ন গুজব ছড়ানো এবং নির্বাচনী সময় ঘনিয়ে আসায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অস্থিরতার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।

বাড্ডা এলাকার স্থানীয় দোকানদার আবদুল কাদের বলেন, “সকালে দোকান খোলার আগ মুহূর্তে দেখি বাসের পেছনে আগুন জ্বলছে। সবাই দৌড়ে আসে। কেউ পানি ছুঁড়ছে, কেউ ফায়ার সার্ভিসে ফোন করছে। ভয় হচ্ছিল, যদি পাশের গাড়িগুলোতেও আগুন লেগে যায়।”

শাহজাদপুরের ঘটনাস্থলেও প্রায় একই পরিস্থিতি। স্থানীয় নারী শাহিনূর বেগম বলেন, “আমার ছেলে স্কুলে যাচ্ছিল, তখনই দেখি রাস্তার পাশে আগুন আর ধোঁয়া। সবাই আতঙ্কে চিৎকার করছে। মনে হচ্ছিল আবার কোনো বড় দুর্ঘটনা না ঘটে।”

এদিকে, বাসমালিক সমিতির পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে “গভীর ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা” বলে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা বাড়ছে, যা সাধারণ যাত্রী ও চালকদের জন্য চরম ঝুঁকির।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক মুখপাত্র বলেন, “আমাদের চালক ও সহকারীরা এখন ভয়ে কাজ করছে। এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা কেবল বাস নয়, পুরো গণপরিবহন খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা। সরকার ও প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক।”

ঘটনার পর ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি বাস টার্মিনাল, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাণিজ্যিক এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যারা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এর আগেও গত মাসে রাজধানীর মিরপুর ও কাকরাইলে দুটি বাসে একই ধরনের অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। তখনও পুলিশ অভিযোগ করেছিল, এই ধরণের ঘটনার পেছনে একটি সংঘবদ্ধ নাশকতাকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।

রাজধানীর ক্রমবর্ধমান অগ্নিসংযোগের এই প্রবণতা সাধারণ নাগরিকদের মাঝেও ভয় তৈরি করেছে। প্রতিদিন সকালে অফিস, স্কুল বা বাজারে যাওয়ার সময় মানুষ এখন ভয়ে বাসে উঠছেন। কেউ কেউ বিকল্প যানবাহন খুঁজছেন, আবার অনেকেই বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন বাসযাত্রা করছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকায় এমন ধারাবাহিক অগ্নিসংযোগ শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে। তারা মনে করছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা মোকাবেলায় সরকারের আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

দিনের শুরুতে ঘটে যাওয়া এই দুই অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রাজধানীবাসী দিনভর ছিলেন আলোচনায়। বাড্ডা থেকে গুলশান, বনানী থেকে মালিবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল উদ্বেগের ছায়া। নাগরিকদের একটাই প্রশ্ন—এই শহর কি আর নিরাপদ?

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশ্বাস অনুযায়ী, তদন্তের ফল আসার পরই হয়তো স্পষ্ট হবে—এই আগুন ছিল আকস্মিক সন্ত্রাস, নাকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিতবাহী এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু আপাতত রাজধানীর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সকালটা শহরের মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছে, অস্থিরতার আগুন নিভলেও তার ছায়া এখনও ঢাকার আকাশে ভাসমান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত