প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ফুটবলে নতুন করে আশার আলো জ্বালাতে আজ ঢাকায় আসছেন ইংলিশ ক্লাব লেস্টার সিটির ফুটবলার হামজা চৌধুরী। বাংলাদেশের জার্সিতে খেলার জন্য যোগ দিতে তিনি আজ সোমবার দুপুরে পা রাখবেন ঢাকায়। আগামী ১৩ নভেম্বর নেপাল এবং ১৮ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে দুটি ম্যাচকে সামনে রেখে জাতীয় দলের এই নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে। এরই মধ্যে টিম ম্যানেজার আমের খান নিশ্চিত করেছেন, হামজা চৌধুরীর পাশাপাশি আগামীকাল মঙ্গলবার রাতে দেশে ফিরবেন আরেক প্রবাসী ফুটবলার শমিত সোম। তাদের সঙ্গে দলে আছেন কিউবা মিচেলও।
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের জন্য এটি শুধু দুটি ম্যাচ নয়, বরং নিজেদের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা পুনর্গঠনের এক বড় সুযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় সমর্থকদের হতাশা বেড়েছিল। তবে লেস্টার সিটির মতো ইংলিশ ক্লাব থেকে খেলে আসা একজন ফুটবলারের যোগদান সেই হতাশা কিছুটা হলেও কাটিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
জাতীয় দলের টিম ম্যানেজার আমের খান সাংবাদিকদের জানান, “হামজা সোমবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকায় পৌঁছাবে। শমিত সোম আসবে ১১ তারিখ রাত ১২টার দিকে। নেপাল ম্যাচে হামজা খেলবে কি না, সেটি পুরোপুরি কোচের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।”
বাংলাদেশ দল বর্তমানে বসুন্ধরার কিংস অ্যারেনায় অনুশীলন করছে। কারণ, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে চলছে এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপ। কোচ হাভিয়ের কাবরেরার অধীনে অনুশীলনে এখনো পুরোপুরি যোগ দেননি প্রবাসী ফুটবলাররা, তবে সবাই অপেক্ষায় রয়েছেন হামজা ও শমিতের উপস্থিতির জন্য। দলের সঙ্গে তাদের যুক্ত হওয়ায় এক নতুন উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে ফুটবলারদের মাঝে।
হামজা চৌধুরীর বাংলাদেশের হয়ে খেলার আগ্রহ নতুন নয়। ইংল্যান্ডের জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার মূলত বাংলাদেশের সিলেটি বংশোদ্ভূত। তাঁর মা বাংলাদেশি এবং তিনি ছোটবেলা থেকেই পরিবারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লেস্টার সিটির হয়ে নিয়মিত খেলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। মাঠে তার ভূমিকা সাধারণত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে, যেখানে তিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের ইতিহাসে এ ধরনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন খেলোয়াড়ের আগমন নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। বিশেষ করে যখন দলটি এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে টানা ব্যর্থতার মুখে, তখন একজন ইউরোপীয় ক্লাবের খেলোয়াড়ের উপস্থিতি দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করবে।
গত ১৪ অক্টোবর হংকংয়ের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করায় বাংলাদেশের এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের আশা কার্যত শেষ হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত চার ম্যাচে দুটি ড্র ও দুটি পরাজয়—এই ফলাফল কোচ কাবরেরার জন্যও এক ধরনের চাপ তৈরি করেছে। সমর্থকরা এখন চান, নেপাল ও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচগুলো হোক ঘুরে দাঁড়ানোর মঞ্চ।
ফেডারেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, হামজার মতো একজন খেলোয়াড় শুধু মাঠে নয়, ড্রেসিংরুমেও প্রভাব ফেলবেন। তার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণের ধরন ও পেশাদার মানসিকতা তরুণ ফুটবলারদের অনুপ্রাণিত করবে।”
হামজা চৌধুরী বাংলাদেশে আসার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীরা তাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। অনেকেই লিখেছেন, “বাংলাদেশ ফুটবলে নতুন সূর্য উঠছে।” কেউ কেউ আবার আশা প্রকাশ করেছেন, “এই প্রজন্মের ছেলেরা হয়তো একদিন বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে পরিচিতি এনে দেবে।”
জাতীয় দলের বর্তমান বাস্তবতা অবশ্য খুব সহজ নয়। দলের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার অভাব, আক্রমণভাগে সৃজনশীলতার ঘাটতি এবং গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থতা বারবার ভুগিয়েছে বাংলাদেশকে। এই জায়গায় একজন সংগঠক ও স্থিতিশীল মিডফিল্ডার হিসেবে হামজার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তার মাঠে অবস্থান, পাসিংয়ের নির্ভুলতা এবং চাপের মধ্যে বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা বাংলাদেশের খেলার ধরনে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে কোচ হাভিয়ের কাবরেরা সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা দলে নতুন রক্ত আনছি। হামজা ও শমিতের যোগদান আমাদের পরিকল্পনার অংশ। আমরা চাই তরুণ ও অভিজ্ঞদের মেলবন্ধনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়ে তুলতে।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের জন্য নেপাল ও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি শুধু প্রস্তুতি নয়, আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের সুযোগও।”
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হামজা ঢাকায় পৌঁছানোর পর মঙ্গলবার থেকেই দলের সঙ্গে অনুশীলনে যোগ দিতে পারেন। তবে প্রথম ম্যাচেই তাকে মাঠে দেখা যাবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবেন কোচ নিজেই।
নেপালের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচটি ১৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে, যা নতুন সংযোজনদের পারফরম্যান্স দেখার একটি সুযোগ তৈরি করবে কোচের জন্য। এরপর ১৮ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের পঞ্চম ম্যাচে নামবে বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচটি বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ঐতিহাসিকভাবে প্রতিবেশী দেশের বিপক্ষে ম্যাচ সবসময়ই গর্ব ও আবেগের প্রতীক হয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের ফুটবল এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিন পর ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে একজন খেলোয়াড় জাতীয় দলে যোগ দিচ্ছেন, যা দেশীয় ফুটবলে নতুন অনুপ্রেরণা যোগাবে। এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে হয়তো শুরু হবে নতুন অধ্যায়—যেখানে ফুটবল শুধু আবেগ নয়, হবে পেশাদারিত্ব ও পরিশ্রমের প্রতিফলন।
বাংলাদেশের ফুটবলভক্তরা এখন তাকিয়ে আছেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে, যেখানে আজ দুপুরে অবতরণ করবেন হামজা চৌধুরী। সবাই আশা করছেন, তার আগমন শুধু একটি খেলোয়াড়ের উপস্থিতি নয়, বরং বাংলাদেশের ফুটবলের পুনর্জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠবে।