স্বাধীন নির্বাচন বনাম পতিত ফ্যাসিবাদ: ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ বার
স্বাধীন নির্বাচন বনাম পতিত ফ্যাসিবাদ: ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং একটি নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সূচনা হিসেবে জনগণ আশা করছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পতিত ফ্যাসিবাদ উৎখাত হয়েছে, সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের নির্বাচন দেশের জন্য একটি নতুন সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই নির্বাচন জনগণের হাতে ক্ষমতা ফেরত দেয়ার এবং দেশকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বমূলক পথে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। জনগণ প্রত্যাশা করে যে নির্বাচনের ফলাফলে গঠিত সরকার হবে ন্যায়, জবাবদিহি ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত।

নির্বাচন শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট নয়, এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য, বিশেষ করে ভারতের প্রভাব, চীনের বিনিয়োগ ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল—মিলিয়ে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এখন এক নতুন সমীকরণের মধ্যে পড়েছে। বিপ্লব-পরবর্তী এই নির্বাচন দেশের সার্বভৌম অবস্থান ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা পুনঃনির্ধারণের একটি সুযোগও এনে দিয়েছে।

তবে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে হলে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিদেশি স্বার্থের টানাপোড়েন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদেশি প্রভাব বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন কূটনৈতিক এবং মিডিয়া-চালিত প্রচেষ্টা এই নির্বাচনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রমাণ হিসেবে ৩০ অক্টোবর, ভারতের দিল্লি থেকে পলাতক শেখ হাসিনার তিনটি আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকার উল্লেখযোগ্য। এসব সাক্ষাৎকারে নির্বাচনকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।

শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারগুলোতে উল্লেখিত বার্তা ছিল অভিন্ন—‘বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়া অন্যায্য’ এবং ‘আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অর্থহীন’। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রচারণা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক মিডিয়া কৌশল, যা নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। দেশীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ভারতের এই প্রচেষ্টা দেশীয় স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করার জন্য সুপরিকল্পিত। সরকারের চোখে, এই মিডিয়া ক্যাম্পেইন কূটনৈতিক চাপের একটি অংশ, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়।

সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চক্র গড়ে উঠেছিল। বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ, অস্ত্র ও ভাড়াটে সংগ্রহের মাধ্যমে নির্বাচনী অনিয়মের সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এছাড়া জাল টাকা, আগুন লাগানো, জনজীবন ব্যাহত করা, বাজার ও গণপরিবহন কেন্দ্র ধ্বংস করা, স্থানীয় রাজনৈতিক অফিস ও শিল্প প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়া—এসব কার্যক্রম মূলত পতিত আওয়ামী লীগ ও বিদেশি প্রভাবের ছায়ায় পরিচালিত হতে চেয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনী এই কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, হটস্পট চিহ্নিত করে তল্লাশি ও তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

ভারতের প্রভাব ও সম্প্রতি শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে গেলে ভারতীয় আধিপত্যের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত শক্তিশালী কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বৈধতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণ করা। দেশের গণতান্ত্রিক শক্তি এবং নিরাপত্তা সংস্থা যৌথভাবে নিশ্চিত করবে যে নির্বাচন প্রকৃত অর্থে জনগণের ভোট ও কণ্ঠের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন শুধুমাত্র সরকার গঠনের জন্য নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সার্বভৌমত্বের পুনঃনির্ধারণ এবং ফ্যাসিবাদী শক্তিকে চিরতরে পরাজিত করার সুযোগ। সরকারের পাশাপাশি সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে, নির্বাচনের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে এবং বিদেশি বা পতিত ফ্যাসিবাদী প্রভাব প্রতিহত করতে হবে।

ফলে, ২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দাঁড়াবে। এটি শুধু নতুন সরকার গঠনের নির্বাচন নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃনিশ্চিত করার একটি সুযোগ। দেশের সকল অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের দায়িত্ব হলো নিরাপদ, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বিদেশি প্রভাব ও পতিত ফ্যাসিবাদী ষড়যন্ত্র থেকে দেশকে রক্ষা করা।

লেখক : একাডেমিক ডিরেক্টর, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সিভিলাইজেশনাল স্টাডিজ (সিজিসিএস)
khaled.du502@gmail.com

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত