প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের প্রভাব ক্রমবর্ধমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা বিভিন্ন স্তরে নির্বাচিত হয়ে দেশটির নীতি ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এই প্রভাবকে আরও দৃঢ় করেছে জোহরান মামদানির নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচিত হওয়া। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এবং অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ২০ জনেরও বেশি মুসলিম প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন, এবং এদের মধ্যে ছয়জন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। তারা সকলেই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হয়ে সক্রিয় রাজনীতি চালাচ্ছেন এবং মুসলিম ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের পক্ষে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
এই ছয়জন নেতার মধ্যে প্রথমজন রাশিদা তালিব, যিনি ১৯৭৬ সালে মিশিগানের ডেট্রয়েটে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ফিলিস্তিনের বাথলাহ গ্রাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করেন। ২০১৮ সালে রাশিদা হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে নির্বাচিত হয়ে প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্য হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তার রাজনৈতিক যাত্রা মুসলিম নারীদের জন্য এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
দ্বিতীয়জন ফাদি কাদ্দুরা। ১৯৮০ সালে পশ্চিম তীরের রামাল্লায় জন্মগ্রহণ করা ফাদি ২০২০ সালে ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের সিনেটে নির্বাচিত হন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। তার নেতৃত্বের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বর বহু গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালায় শোনা যাচ্ছে।
তৃতীয়জন ইমান জোদেহ। তার পরিবার ১৯৭৪ সালে ফিলিস্তিন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করে। ইমান ১৯৮৩ সালে ডেনভারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০২০ সালে কলোরাডো হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি কলোরাডো সিনেটে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সমতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান প্রদর্শন করে।
চতুর্থজন রুয়া রোমান। ১৯৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করা রুয়া’র পরিবার ফিলিস্তিন থেকে জর্ডান হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ২০২২ সালে তিনি জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে নির্বাচিত হন। তার নির্বাচনী সাফল্য মুসলিম ও ফিলিস্তিনি নারীদের জন্য এক নতুন রাজনৈতিক উদাহরণ স্থাপন করেছে।
পঞ্চমজন আব্দুল নাসের রাশিদ। ১৯৮৯ সালে জন্ম নেওয়া রাশিদ ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রীপ্রাপ্ত এই তরুণ নেতা ২০২৩ সালে ইলিনয় হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে নির্বাচিত হন। তিনি তরুণ মুসলিম নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
ষষ্ঠজন স্যাম রাসুল। তার বাবা-মা ১৯৬৭ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ভার্জিনিয়ার রোয়ানোক উপত্যকায় বেড়ে ওঠা স্যাম বর্তমানে ভার্জিনিয়া হাউস অফ ডেলিগেটসে দ্বিতীয় দফায় নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি স্থানীয় সম্প্রদায়ের উন্নয়ন এবং মানবাধিকার সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন।
এই ছয়জন নেতার রাজনৈতিক যাত্রা যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও অভিবাসী বংশোদ্ভূত নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিচ্ছবি। তারা তাদের ফিলিস্তিনি শিকড় ও মুসলিম পরিচয়কে শক্তি ও আত্মপরিচয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছেন। মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার পক্ষে তাদের কণ্ঠস্বর দৃঢ়।
যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ও বিজয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা বোর্ড ও কমিউনিটি নীতিমালায়ও মুসলিম নেতাদের প্রভাব স্পষ্ট।
যদিও এই অগ্রগতি সহজে অর্জিত হয়নি। ধর্মীয় ও বর্ণভিত্তিক মানসিকতা, ইসলামভীতি এবং পরিচয়জনিত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তারা দৃঢ় মনোবল দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই তরুণ প্রজন্ম যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিচ্ছে।
ফলস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরে মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নেতাদের উত্থান কেবল কমিউনিটির জন্য নয়, পুরো দেশের নীতি নির্ধারণে বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি ও সমতার দিকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। তারা প্রমাণ করেছেন যে, স্ব-পরিচয় ও সাংস্কৃতিক শিকড়কে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি সম্ভব।